হ্যাকিং ঠেকাতে চাই একঝাঁক প্রফেশনাল
প্রকাশ : ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৭, ১৬:৪৮
হ্যাকিং ঠেকাতে চাই একঝাঁক প্রফেশনাল
উজ্জ্বল এ গমেজ
প্রিন্ট অ-অ+

ব্যাংকিংসহ সব সেক্টরে সাইবার নিরাপত্তা নিয়ে জনসচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে কর্মরত অলাভজনক সংগঠন সিটিও ফোরাম, বাংলাদেশ। তাদের কার্যক্রম নিয়ে সম্প্রতি বিবার্তা২৪ডটনেটের সাথে কথা বলেন সিটিও ফোরাম বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা-সভাপতি তপন কান্তি সরকার। তার সাথে দীর্ঘ আলাপের কিছু চুম্বক অংশ বিবার্তার পাঠকদের জন্য তুলে ধরেছেন প্রতিবেদক উজ্জ্বল এ গমেজ।


বিবার্তা : সিটিও ফোরাম বাংলাদেশ সংগঠনটি কেন, আপনারা আসলে কী করছেন - আমাদের পাঠকদের একটু জানান।


তপন কান্তি সরকার : যেখানেই তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে লেনদেন হয় সেখানেই নিরাপত্তা প্রয়োজন। সকল অনলাইন তথ্য ও লেনদেন যেন সুরক্ষিত থাকে সেই লক্ষ্যেই সিটিও ফোরাম বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান, এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গেও কাজ করছে।


উন্নত বিশ্ব এখন তথ্যনিরাপত্তা নিয়ে খুবই সিরিয়াস। সে তুলনায় তথ্যনিরাপত্তার দিক থেকে আমরা খুব বেশি পিছিয়ে নেই। সরকারের পক্ষ থেকে এ নিয়ে ব্যাপক উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্য বাস্তবায়ন করতে সরকারের সাথে সিটিও ফোরাম বাংলাদেশও বিভিন্ন পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।


বিবার্তা : বর্তমানে দেশের সাইবার নিরাপত্তা পরিস্থিতি কেমন?


তপন কান্তি সরকার : ‘সাইবার অপরাধ’ বলতে মূলত ইন্টারনেট ও কম্পিউটার ব্যবহারের মাধ্যমে সংঘটিত অপরাধকে বুঝায়। সাইবার নিরাপত্তা আইন-২০১৫ সালের খসড়া প্রস্তুত করা হয়েছে কিন্তু আইনটি পর্যাপ্ত নয়। প্রযুক্তি সম্পর্কে বাংলাদেশের ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের জ্ঞান কম। তাদের বিপদে পড়ার সম্ভাবনাই বেশি।


তাছাড়া হ্যাকাররা কখনোই প্রচলিত আইনের তোয়াক্কা করে না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তারা থাকে ধরাছোঁয়ার বাইরে। তাই মেধাবী শিক্ষার্থীদের উদ্ভাবনী ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে প্রফেশনালদের সাথে নিয়ে ‘আরঅ্যান্ডডি’ অ্যাকশনেবল ইন্টেলিজেন্স ল্যাব গঠন করে দেশে এক ঝাঁক প্রফেশনাল বুদ্ধিমত্তার জন্ম দিতে হবে, যারা পারবে হ্যাকিংয়ের বিরুদ্ধে পাল্টা প্রতিরক্ষা গড়ে তুলতে।


বিবার্তা : দেশে এটিএম কার্ড জালিয়াতি, বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরি এসব ঘটনা ঘটছে কেন?


তপন কান্তি সরকার : এটিএম কার্ড জালিয়াতির পর বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির ঘটনায় বাংলাদেশে অনলাইন নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞের ঘাটতি আছে বলে আমার মনে হয়েছে। তবে অনলাইন নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞের ঘাটতি না যতটুকু আছে তার চেয়ে বড় হলো সচেতনতার অভাব। ফলে বিভিন্ন সময়ে এটিএম কার্ড নকল এবং গ্রাহকের তথ্য হ্যাকিংয়ের ঘটনা ঘটেছে।


বিবার্তা : কেন্দ্রীয় ব্যাংকে রির্জাভ চুরি হয়েছে। এটা শুরু না শেষ। আপনার অভিজ্ঞতা কী বলে?


তপন কান্তি সরকার : বর্তমান সরকারের বলিষ্ঠ নেতৃত্ব ও দূরদর্শী পরিকল্পনার ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক দেশের আর্থিক খাত ডিজিটালাইজড করতে বিভিন্ন উদ্যোগ সফলভাবে বাস্তবায়ন করেছে। প্রায় সব ব্যাংকই ডিজিটাল সেবার আওতায় আনার সুফল সবাই পাচ্ছে। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের হ্যাকিংয়ের বিষয়টি অনাকাঙ্ক্ষিত। অপ্রত্যাশিতভাবেই ঘটেছে এটি। আমার মনে হচ্ছে, ইতোমধ্যেই সরকার থেকে শুরু করে সব ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এ বিষয়ে সচেতন হয়েছেন। পরবর্তীতে এ ধরনের ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা খুবই কম বলে আশা করছি।


বিবার্তা : সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে কী করা জরুরি?


তপন কান্তি সরকার : ডিজিটাল সম্পদের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে অগ্রাধিকার দিয়ে জাতীয় পর্যায়ে বিবেচনায় আনতে হবে। মাঠ পর্যায়ে সরকারের পক্ষ থেকে বাস্তবায়নের বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। এ ক্ষেত্রে কোনো প্রতিষ্ঠানের প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে পরিচালনা পর্ষদ, নির্বাহী পর্ষদ এবং একদল তথ্যপ্রযুক্তি নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। আর হ্যাকিং রোধে চারটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। এগুলো হচ্ছে প্রযুক্তি নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ দল গঠনে তত্ত্বগত ও ব্যবহারিক দুই ধরনের জ্ঞানকে বিবেচনায় আনতে হবে। সেবা অনুযায়ী নেটওয়ার্ক নকশা বিভাজিত হতে হবে এবং নেটওয়ার্ক ডিভাইসগুলো অ্যাপ্লিকেশন আর্কিটেকচার এবং নকশা অনুযায়ী বাস্তবায়ন করতে হবে। এখানে বাজেটের বিষয়ে কোনো ধরনের ছাড় দেয়া যাবে না।


বিবার্তা : হ্যাকারদের আক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়ার উপায় কি?


তপন কান্তি সরকার : কোনো প্রতিষ্ঠানের নেটওয়ার্কে যত ধরনের ডিভাইস আছে, সব প্রয়োজনমতো শক্তিশালী করতে হবে। প্রতিনিয়ত সিকিউরিটি আপডেট, প্যাচওয়ার্ড আপডেট নিশ্চিত করতে হবে। সর্বোপরি তথ্যপ্রযুক্তি নিরাপত্তা বিষয়ে প্রযুক্তিগত এবং পেশাগত দক্ষতা অর্জনের জন্য প্রতিনিয়ত উন্নতমানের প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে।


বিবার্তা : সাইবার নিরাপত্তা নিয়ে জনসচেতনতা বাড়াতে সিটিও ফোরাম কী ভূমিকা রাখছে?


তপন কান্তি সরকার : আমরা তথ্যপ্রযুক্তির নিরাপত্তা নিয়ে অনেকগুলো সেমিনার ও গোলটেবিল বৈঠক করেছি, যেখানে দেশীয় তথ্যপ্রযুক্তিবিদদের সাথে আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের জ্ঞান বিনিময়ের সুযোগ হয়েছে। যার মাধ্যমে ব্যাংকিং সেক্টরের তথ্যপ্রযুক্তিখাতে কর্মরত কর্মকর্তাদের নতুন নতুন প্রযুক্তিনির্ভর জ্ঞান অর্জন ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের সুযোগ হয়েছে। তবে সত্যি বলতে কী, আমাদের দেশে এ বিষয়ে বাস্তবায়ন পর্যায়ে বড় বাজেট একটা বিশাল বাধা হিসেবে কাজ করছে।


বিবার্তা : বাংলাদেশে অনলাইন ব্যাংকিংয়ের নিরাপত্তা কেমন?


তপন কান্তি সরকার : এই মুহূর্তে বাংলাদেশে ৫৭টি ব্যাংক ও ৩৫টি আর্থিক প্রতিষ্ঠান আছে, যাদের প্রায় ৯০ লাখ গ্রাহক ডেবিট বা ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করেন। বিভিন্ন সময়ে এটিএম কার্ড নকল ও গ্রাহকের তথ্য হ্যাকিংয়ের ঘটনাও ঘটেছে। তবে বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশে ঘটা ঘটনাগুলোতে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ বেশি নয়।


সম্ভাবনাময় এই খাতের উন্নয়নে প্রধান অন্তরায় অনলাইন লেনদেনের নিরাপত্তা। বিগত কয়েক বছরে বাংলাদেশ ব্যাংক আরটিজিএস, বিএফটিএন, ইএফটি, ন্যাশনাল পেমেন্ট সুইচসহ অনেকগুলো প্রযুক্তিনির্ভর সেবা চালু করেছে। আমাদের অনলাইন ব্যাংকিংয়ের নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরো উন্নত করতে হবে। একই সঙ্গে গ্রাহকদের মধ্যেও ইলেকট্রনিক লেনদেনের ব্যাপারে যে সচেতনতার অভাব রয়েছে, প্রতিষ্ঠানগুলোকে সেদিকেও মনোযোগ দিতে হবে। আমাদের অবশ্যই পিসিআই-ডিএসএস ও ইএমভির মতো প্রযুক্তি ব্যবহার বাধ্যতামূলক করতে হবে এবং ব্যাংকগুলোকে নিরাপত্তা নিশ্চিত করে সেবার মান আরো বাড়াতে হবে।


বিবার্তা : অনলাইন ব্যাংকিংয়ে গ্রাহকদের সচেতনতা বাড়াতে কী উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে?


তপন কান্তি সরকার : অনলাইন ব্যাংকিংয়ে গ্রাহকদের বাড়াতে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে সভা-সেমিনারের আয়োজন করা যেতে পারে। আমি অনলাইন ব্যাংকিংয়ে গ্রাহকদের লেনদেন তথা অর্থের নিরাপত্তার বিষয়টিকে সবচেয়ে বেশি জোর দেয়া প্রয়োজন বলে মনে করি। গ্রাহকদের সমস্ত তথ্য যেন সুরক্ষিত এবং নিরাপদ থাকে সেদিকে ব্যাংকগুলোকে সর্বোচ্চ সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে।


বিবার্তা : দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলাতে অনলাইন নিরাপত্তা নিয়ে যা শেখানো হচ্ছে তা কী যথেষ্ট? সিটিও ফোরাম এ বিষয়ে কোনো উদ্যোগ নিচ্ছে কি?


তপন কান্তি সরকার : দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলাতে অনলাইন নিরাপত্তা নিয়ে সেরকম বিশেষ কোর্স খুব কমই রয়েছে। যে কোর্সগুলো পড়ানো হয় তা খুবই প্রাথমিক পর্যায়ের। তবে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে আমাদের সমঝোতা চুক্তি হয়েছে, যার মাধ্যমে বিভিন্ন সেমিনারের আয়োজন করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এবং ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করছি।


বিবার্তা : নতুন বছরে সিটিও ফোরামের পরিকল্পনা কি?


তপন কান্তি সরকার : সিটিও ফোরাম বাংলাদেশ ২০০৯ সাল থেকে তথ্যপ্রযুক্তির বিভিন্ন বিষয় নিয়ে সচেতনতামূলক বিভিন্ন সভার আয়োজন করে যাচ্ছে। বর্তমানে অনেকে বিচ্ছিন্নভাবে কাজ করছে। কিন্তু একটি সমন্বিত প্রচেষ্টা ছাড়া নিরাপদ তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার প্রায় অসম্ভব। তাই সিটিও ফোরামের উদ্যোগে সম্প্রতি ইনফরমেশন সিকিউরিটি এলায়েন্স (আইএসএ) যাত্রা শুরু করেছে।


আমরা ২০১৭ সালে আইএসএ-র মাধ্যমে তথ্যপ্রযুক্তিবিদদের জন্য ট্রেনিং এবং ব্যবহারকারীদের জন্য সচেতনতামূলক সেমিনারের আয়োজন করব। আশা করি, সকলে নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্বের সাথে অনুধাবন করবে এবং নিরাপদ তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারে সচেতন হবে।


বিবার্তা/উজ্জ্বল/মৌসুমী/হুমায়ুন

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: bbartanational@gmail.com, info@bbarta24.net

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com