ই-কমার্সকে আলাদা সেক্টর হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায় ই-ক্যাব
প্রকাশ : ০৮ জানুয়ারি ২০১৭, ২০:১৫
ই-কমার্সকে আলাদা সেক্টর হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায় ই-ক্যাব
উজ্জ্বল এ গমেজ
প্রিন্ট অ-অ+

বর্তমানে দেশে তথ্যপ্রযুক্তি সেক্টরে কাজ করার জন্য অনেক উদ্যোক্তা এগিয়ে আসছেন। কিন্তু এখনো ট্রেড লাইসেন্সে ‘ই-কমার্স’ বলে আলাদা কোন ক্যাটাগরি নেই। আমরা এটাকে আলাদা সেক্টর হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার জন্যে কাজ করে যাচ্ছি।


শনিবার বিকেলে রাজধানীর ধানমন্ডিতে ই-ক্যাবের কার্যালয়ে একান্ত আলাপচারিতায় বিবার্তাকে বলেন ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ই-ক্যাব)এর সভাপতি রাজিব আহমেদ। তিনি দেশের ই-কমার্স খাত নিয়ে তার চিন্তা-ভাবনা, অগ্রগতি ও ভবিষ্যৎ করণীয় সম্পর্কে বিস্তারিত জানিয়েছেন। তার সাথে দীর্ঘ আলাপের কিছু চুম্বক অংশ বিবার্তার পাঠকদের জন্য তুলে ধরেছেন প্রতিবেদক উজ্জ্বল এ গমেজ।


বিবার্তা : ই-ক্যাব সংগঠনটির শুরুটা কীভাবে?


রাজিব আহমেদ : ই-ক্যাব হলো দেশের ই-কমার্স খাতের ট্রেড বডি। সংগঠনটি একেবারে নতুন। ২০১৫ সালের ৮ জুলাই ই-ক্যাব বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন পায়। একই বছরের আগস্টে জয়েন্ট স্টকের সনদ পায়। ওই বছরেই ১১ অক্টোবর ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বারস অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফবিসিসিআই) সদস্য হয়। পূর্ণাঙ্গ অ্যাসোসিয়েশন হিসেবে ই-ক্যাবের বয়স মাত্র এক বছর পূর্ণ হয়েছে। ই-ক্যাব এ সময়ের মধ্যেই খাতসংশ্লিষ্ট সব দিকে কাজ করার চেষ্টা করে যাচ্ছে।



বিবার্তা : ই-ক্যাবের কার্যক্রম সম্পর্কে জানতে চাই।


রাজিব আহমেদ : যেকোনো বাণিজ্য সংগঠনেরই কাজ হচ্ছে খাতসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান বা ইন্ডাস্ট্রির স্বার্থ রক্ষা। ই-কমার্সের ক্ষেত্রে গ্রাহকদের স্বার্থ রক্ষাও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ক্রেতারা অনলাইনে পণ্য ক্রয়ে আস্থা না পেলে ই-কমার্সের প্রকৃত প্রসার ঘটবে না। ই-ক্যাবের চেষ্টায় দেশের ই-কমার্স খাতকে শুল্কমুক্ত রাখা সম্ভব হয়েছে। ই-কমার্স খাত সম্পূর্ণ ভ্যাটমুক্ত। কিন্তু যেসব কম্পানি ফিজিক্যাল স্টোর ও অনলাইন দুইভাবে ব্যবসা করে, তাদের ক্ষেত্রে ভ্যাট প্রযোজ্য।


আমরা যে বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করছি সেগুলো হলো, অনলাইন শপ, ই-সার্ভিস, ই-পেমেন্ট অ্যান্ড ট্রানজ্যাকশন, ই-সিক্যুরিটি, ই-কমার্স পলিসি, সার্ভিস ডেলিভারি, ই-কমার্স সচেতনতা ও প্রশিক্ষণ, গবেষণা এবং প্রডাক্ট কোয়ালিটি ইমপ্রুভমেন্ট। ইতোমধ্যেই ই-কমার্স খাতের উদ্যোক্তাদের জন্য প্রশিক্ষণ চালু করেছে ই-ক্যাব। প্রথম ধাপে ১০০ জনকে বিনামূল্যে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। বাংলাদেশে ই-কমার্স এখনো খুব বেশি সম্প্রসারিত হয়নি। আশা করছি, ২০১৭ সালের মধ্যে ই-কমার্স খাতের পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বদলে ফেলা সম্ভব হবে।


বিবার্তা : ই-ক্যাব সংগঠনটির কার্যনির্বাহী পরিষদ সম্পর্কে বলুন।


রাজিব আহমেদ : ই-ক্যাবে নয় সদস্যবিশিষ্ট একটি কার্যনির্বাহী পরিষদ রয়েছে। এছাড়াও ই-ক্যাব কার্যালয়ের দৈনন্দিন কাজকর্ম পরিচালনার জন্যে নির্বাহী পরিচালক রয়েছেন। একটি উপদেষ্টা কাউন্সিল আছে। ই-কমার্সের সাথে ব্যাংক, মোবাইলসহ অন্যান্য বিভিন্ন ইন্ডাস্ট্রি সংযুক্ত আছে। এসব ক্ষেত্রগুলোতে কাজ করার জন্যে আমরা ২৫টি স্ট্যান্ডিং কমিটি গঠন করেছি।



বিবার্তা : বর্তমানে কোন মাধ্যমে সবচেয়ে বেশি ই-কমার্স করা হচ্ছে?


রাজিব আহমেদ : বর্তমানে এক হাজারের মতো ওয়েবসাইট এবং প্রায় আট হাজার ফেসবুক পেজের মাধ্যমে অনলাইনে পণ্য বিক্রি হচ্ছে। পাশাপাশি ই-কমার্সের মাধ্যমে প্রতিদিন ২০ হাজার ও মাসে প্রায় পাঁচ-ছয় লাখ পার্সেল সরবরাহ হচ্ছে।


তবে এর বর্তমান বাজারমূল্য সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য নেই। উদ্যোক্তা, খাতসংশ্লিষ্ট কম্পানি, কুরিয়ার সার্ভিস ও ব্যাংকগুলোর সঙ্গে কথা বলে যেটা জানা যায়, তাহলো, ‘ক্যাশ অন ডেলিভারি’ ভিত্তিতে ই-কমার্স খাতের লেনদেন হয় বেশি। এ ধরনের লেনদেনের রেকর্ড সংগ্রহ প্রায় অসম্ভব কাজ।


বিবার্তা : ই-কমার্সকে গুরুত্ব দিতে হবে কেন?


রাজিব আহমেদ : চীনের ই-কমার্স ইন্ডাস্ট্রির বাজারমূল্য এখন ৬০ হাজার কোটি ডলার। কিছুদিনের মধ্যে ভারতের বাজার ১০ হাজার কোটি ডলার ছাড়িয়ে যাবে। বাংলাদেশে খাতটির মূল্য এখনো শতকোটি ডলারে পৌঁছায়নি। চীনে প্রতিদিন গড়ে পাঁচ-ছয় কোটি পণ্য সরবরাহ হয় ই-কমার্সের মাধ্যমে। বাংলাদেশে এর পরিমাণ মাত্র ২০ হাজার। ফিজিক্যাল স্টোরের মাধ্যমে কেনাবেচা একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত চলে। কিন্তু ই-কমার্সের মাধ্যমে কেনাবেচার কোনো নির্দিষ্ট সময় নেই। যখন খুশি তখন পণ্য কিনতে পারছেন। টাকা যত হাতবদল হবে, তত বেশি অর্থনীতির চাকা ঘুরবে, জিডিপির প্রবৃদ্ধি হবে। ই-কমার্স বা ঘরে বসে কেনাকাটাকে বড়লোকের ফ্যাশন বিবেচনা করা ঠিক হবে না। এর সঙ্গে সাধারণ মানুষের সম্পৃক্ততা বাড়াতে হবে। তা না হলে আমরা পিছিয়ে থাকব।



বিবার্তা : ই-ক্যাবের সদস্য হতে কী দরকার হয়?


রাজিব আহমেদ : আমরা চাই তরুণ ও নতুন উদ্যোক্তারা ই-ক্যাবের সদস্য হোক। ই-ক্যাবের সদস্য হতে তেমন বেশি কিছুর দরকার হয় না। একটি প্রতিষ্ঠানের ট্রেড লাইসেন্স, টিআইএন এবং জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি থাকলেই যথেষ্ট। আর সদস্য ফি মাত্র ৩ হাজার টাকা। এর মধ্যে এককালীন রেজিস্ট্রেশন ফি-১০০০ টাকা এবং বার্ষিক সদস্য চাঁদা-২০০০ টাকা। সদস্যদের প্রতি বছর ২০০০টাকা দিয়ে সদস্যপদ পুনঃবহাল করতে হবে। সংগঠনটির সদস্য সংখ্যা এরই মধ্যে ৫০০ ছাড়িয়েছে।


বিবার্তা : দেশের ই-কমার্স খাতে কী কী প্রতিবন্ধকতা রয়েছে?


রাজিব আহমেদ : বর্তমানে রাজধানীকে ঘিরেই গড়ে উঠেছে ই-কমার্সের মূল বাজার। ঢাকার বাইরে ই-কমার্স সাইট নেই। ই-কমার্সকে গ্রাম পর্যন্ত ছড়িয়ে দেয়াটা একটা বিশাল চ্যালেঞ্জ। স্থানীয় ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলোর অধিকাংশেরই নিজস্ব কোনো সরবরাহব্যবস্থা নেই। এক্ষেত্রে বিভিন্ন কুরিয়ার সার্ভিসের সহায়তা নিতে হচ্ছে। করতোয়া, সুন্দরবন বা এসএ পরিবহনের মতো প্রতিষ্ঠান ই-কমার্সের গুরুত্ব এখনো বুঝতে পারছে না। যেসব কুরিয়ার কম্পানি আগ্রহী, তাদের সামর্থ্য কম।


অনলাইনে লেনদেন এখনো বাংলাদেশে জনপ্রিয় নয়। ক্যাশ অন ডেলিভারি হচ্ছে ই-কমার্সে সবচেয়ে জনপ্রিয় লেনদেন মাধ্যম। কিন্তু এটি ই-কমার্সের উন্নয়নের ক্ষেত্রে ভবিষ্যতে বিশাল সমস্যার সৃষ্টি করবে। ক্যাশ-অন-ডেলিভারি থেকে আমাদের ক্রেতাকে বের করে আনতে হবে। গ্রাহক হয়রানি একটি বড় সমস্যা। গ্রাহকের বিশ্বাস তৈরি না করতে পারলে ই-কমার্স সামনে এগিয়ে যাবে না। গ্রাহকদের বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়ানোর জন্যে আমরা কাজ করে যাচ্ছি।



ই-কমার্সকে ছড়িয়ে দিতে হলে আমাদের অবশ্যই ইন্টারনেটকে সহজলভ্য করতে হবে। এ মুহূর্তে ই-কমার্স ব্যবসায় সবচেয়ে বড় বাধা নিশ্চিন্তে পণ্য ডেলিভারী দেওয়া। দেশব্যাপী শতভাগ ই-কমার্সবান্ধব ডেলিভারী প্রতিষ্ঠান আমাদের দেশে নেই। নির্ধারিত সময়ে পণ্য ডেলিভারি হচ্ছে না এবং ফোন ধরলে কুরিয়ার সার্ভিসের লোকজন ফোন ধরছেন না। ফলে কাস্টমার অসন্তুষ্ট হচ্ছেন এবং বিশ্বাস হারাচ্ছেন।


আরেকটি বড় সমস্যা হচ্ছে, এ খাত এখনো নিয়মতান্ত্রিক কোনো উপায়ে চলছে না। কার্যক্রম শুরু করলেও অনেক প্রতিষ্ঠান শৃঙ্খলাহীন। ই-ক্যাবের ফেসবুক গ্রুপে প্রায়ই বিভিন্ন বিষয়ে অভিযোগ পাই। এক্ষেত্রে আমি গ্রাহকদের ই-ক্যাবের সদস্য এমন সাইট থেকে পণ্য ক্রয়ের পরামর্শ দেব। কারণ সেক্ষেত্রে আমরা ব্যবস্থা নিতে পারি।


বিবার্তা : ই-ইকমার্স নিয়ে নতুন বছরে ই-ক্যাবের পরিকল্পনা কী?


রাজিব আহমেদ : বর্তমানে বাংলাদেশের অর্থনীতির তিনটি প্রধান স্তম্ভ হচ্ছে, কৃষি, তৈরি পোশাক খাত এবং রেমিটেন্স। ই-কমার্সকে বাংলাদেশের অর্থনীতির এরকম চতুর্থ আরেকটি খাত হিসেবে গড়ে তুলতে চাই। বাংলাদেশে ই-কমার্সের সেরকম সম্ভাবনা রয়েছে। বর্তমানে ই-কমার্স বলে আলাদা কোন সেক্টর নেই। এটাকে আলাদা সেক্টর হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চাই। ইতিমধ্যেই প্রাণ আরএফএল, এসিআই, বিটিআই, আড়ং, এফবিসিসিআই, বেসিস, বিসিএস, বাক্য, সিটিও ফোরামের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো আমাদের সদস্য হয়েছে। নতুন বছরে অন্যরাও সংযুক্ত হবে বলে আশা রাখি। সঠিক দিক-নির্দেশনা ও সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা পেলে এ সেক্টরে যেমন অনেক নতুন ব্যবসার ক্ষেত্র সৃষ্টি হবে, তেমনি অনেক নতুন চাকুরির সৃষ্টি হবে। আর শিগগিরই ই-কমার্স হবে দেশের সবচেয়ে বড় ইন্ডাস্ট্রি।


বিবার্তা/উজ্জ্বল/হুমায়ুন/মৌসুমী

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: bbartanational@gmail.com, info@bbarta24.net

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com