'মুক্তিযুদ্ধে নদীর ঋণ শোধ করেনি স্বাধীন বাংলাদেশ'
প্রকাশ : ১৬ ডিসেম্বর ২০১৯, ২০:৫৫
'মুক্তিযুদ্ধে নদীর ঋণ শোধ করেনি স্বাধীন বাংলাদেশ'
উজ্জ্বল এ গমেজ
প্রিন্ট অ-অ+

লেখক ও গবেষক শেখ রোকন নদী বিষয়ক নাগরিক উদ্যোগ রিভারাইন পিপলের প্রতিষ্ঠাতা ও মহাসচিব। গত দুই দশক ধরে তিনি নদী নিয়ে লেখালেখি, গবেষণা, প্রচারণামূলক কাজ করছেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিষয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর এবং যুক্তরাষ্ট্রের ওকলাহোমা বিশ্ববিদ্যালয় ও ভারতের সিকিম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পরিবেশ ও নদী বিষয়ে শর্টকোর্স সম্পন্ন করেছেন।


নদী বিষয়ে তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে নদীচিন্তা, বিষয় নদী, নদী প্রসঙ্গ, মেঘনাপাড়ের সংকট ও সংগ্রাম। মুক্তিযুদ্ধে নদীর ভূমিকা নিয়েও তার গবেষণা রয়েছে। বিবার্তার সঙ্গে কথা বলেছেন মুক্তিযুদ্ধে নদীর ভূমিকা নিয়ে।


বিবার্তা: আপনি মুক্তিযুদ্ধে নদীর ভূমিকা নিয়ে গবেষণা করছেন, লিখছেন। নদীর সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের যোগসূত্র প্রথম কীভাবে ভাবনায় এসেছিল?


শেখ রোকন: এর কারণ আমার জন্মভূমি, কুড়িগ্রামের রৌমারী। ওই এলাকা মুক্তিযুদ্ধের পুরো সময় ‘মুক্তাঞ্চল’ ছিল। কখনোই পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী সেখানে প্রবেশ করতে পারেনি। আপনি জেনে অবাক হতে পারেন, সেখানে গড়ে উঠেছিল স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম বেসামরিক প্রশাসন ব্যবস্থা। এপ্রিল থেকেই চালু হয়েছিল স্বাধীন বাংলাদেশের পুলিশ, প্রশাসন, ডাক ব্যবস্থা, আদালত, এমনকি কর আদায় ব্যবস্থা। সেখান থেকে হাতে লিখে সাইক্লোস্টাইল করে প্রকাশ হতো সাপ্তাহিক পত্রিকা। নাম অগ্রদূত। ওই পত্রিকার সংখ্যাগুলো আমার সংগ্রহে রয়েছে। সেখানে স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে বিজ্ঞপ্তি, প্রজ্ঞাপন প্রকাশ হতে দেখেছি। সেখানে স্বাভাবিকভাবেই গড়ে উঠেছিল মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণকেন্দ্র। এই যে এতকিছু নির্বিঘ্নে গড়ে তোলা সম্ভব হয়েছিল নদীর কারণে। বৃহত্তর রৌমারী বা আজকের রৌমারী-রাজীবপুর উপজেলা জেলা বা তখনকার মহকুমা সদর কুড়িগ্রাম থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল বিশাল ব্রহ্মপুত্র নদী দিয়ে। অপরদিকে এলাকাটি ভারতের মানকারচর শহরের সঙ্গে স্থলপথে যুক্ত ছিল। পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী এতবড় নদী পাড়ি দিয়ে রৌমারী যাওয়ার সাহস পায়নি। বরং মুক্তিযোদ্ধারা রৌমারী থেকে ব্রহ্মপুত্র নদী পাড়ি দিয়ে চিলমারী অপরাশেনসহ বিভিন্ন গেরিলা অপারেশন চালিয়েছে।


বিবার্তা: এ বিষয়ে কাজ শুরু করলেন কখন?


শেখ রোকন: মুক্তিযুদ্ধে নদীর ভূমিকা নিয়ে গবেষণা আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু করা হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় নিজের এলাকার মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে খোঁজ-খবর করতে গিয়ে বিষয়টি প্রথম হাতে কলমে প্রত্যক্ষ করি। আপনি জানেন হয়তো, বীরপ্রতীক তারামন বিবি একই এলাকার মানুষ। তিনি যে যুদ্ধে সাহসীকতার জন্য এই স্বীকৃতি পেয়েছেন, তার নাম কোদালকাটির চর। এটা ব্রহ্মপুত্রের মধ্যে একটি বিশাল চর। একদিকে ব্রহ্মপুত্র নদী, অন্যদিকে হলহলিয়া নদী। পাকিস্তানী বাহিনী একটি যুদ্ধ জাহাজ নিয়ে কোদালকাটিতে গড়ে ওঠা মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিরক্ষা ব্যূহ ভাঙতে গিয়েছিল। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধা ও সাধারণ মানুষের প্রতিরোধের মুখে তারা পরাজিত হয়। তাদের জাহাজ ধ্বংস হয়। এই যুদ্ধক্ষেত্র সরেজমিন দেখতে গিয়ে দেখলাম, বাঙালিরা সুবিধা পেয়েছিল কারণ তারা নদী পারাপারে অভ্যস্ত। দেশী নৌকা চালিয়ে, পানিতে সাঁতরে যুদ্ধ করেছে। অন্যদিকে পাকিস্তানীরা নদীকে ভয় পেতো। ফলে অস্ত্রশস্ত্রে বেশি শক্তিশালী থাকলেও ভৌগলিক অবস্থান ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের পক্ষে। কোদালকাটি থেকে ফেরার পরই মুক্তিযুদ্ধে নদীর ভূমিকা আমার কাছে স্পষ্ট হতে থাকে এবং বিষয়টি নিয়ে আরো খোঁজ-খবর, পড়াশোনা করতে থাকি।


বিবার্তা: কী পেলেন


শেখ রোকন: পেলাম যে, কেবল রৌমারী নয়, গোটা দেশেই নদ-নদী মুক্তিযুদ্ধে অবিস্মরণীয় ভূমিকা রেখেছে বাংলাদেশে পক্ষে, বাঙালিদের পক্ষে। পাকিস্তানী বাহিনীর পরাজয় শুরু হতে থাকে আসলে নৌযুদ্ধে পরাজয়ের মধ্য দিয়ে। আপনি দেখবেন, হাওরাঞ্চলে দাসপার্টি বা দক্ষিণাঞ্চলে হেমায়েত বাহিনীর যোদ্ধারা পাকিস্তানীদের বিরুদ্ধে দুঃসাহসিক সব প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছিল। এর কারণ এই দুই এলাকা নদী ও জলাশয় বহুল। সেখানে পাকিস্তানী বাহিনীকে বাগে ফেলা বাঙালির পক্ষে সহজ ছিল। নদী মানেই যেন বাঙালির জন্য বরাভয়। আর পাকিস্তানীদের জন্য আতঙ্ক।


বিবার্তা: এই বাস্তবতা কি শুধু হাওরাঞ্চল বা দক্ষিণাঞ্চলেরর জন্য? বা যেখানে ব্রহ্মপুত্র বা গঙ্গার মতো বড় নদী রয়েছে সেখানের জন্য?


শেখ রোকন: না, না, সারা দেশের জন্যই। যত ছোট নদীই হোক বাঙালির জন্য প্রতিরক্ষা দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছে। যেমন মুক্তিযোদ্ধারা রাতের বেলা ছোট ছোট দেশীয় নৌকায় চলাচল করতো। অনেক সময় সাঁতরেও পার হতো নদী। পাকিস্তানীদের জন্য এভাবে চলাচল তো কল্পনাও করা যায় না। এমনকি আপনি যদি ২৫ মার্চের কাল রাতের কথাও ধরেন, প্রথম সুযোগেই ঢাকার মানুষ বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু, শীতলক্ষ্যা পার হতে চেয়েছে। তাদের মধ্যে বদ্ধমূল ধারনা ছিল যে, নদীর ওপাড়ে যেতে পারলেই তারা নিরাপদ। পাকিস্তানী বাহিনী সহজে নদী পাড় হতে পারবে না। তখন এত সেতুও ছিল না। এই অর্থে আপনি বলতে পারেন, নদীগুলো ছিল আক্রান্ত বাঙালির জন্য প্রাথমিক ত্রাতা। মুক্তিযোদ্ধাদের বেশিরভাগ প্রশিক্ষণ কেন্দ্র বা ঘাঁটি ছিল নদী দিয়ে ঘেরা এলাকায়।



বিবার্তা: একাত্তরে নদীই তো যাতায়াত ব্যবস্থার প্রধান মাধ্যম ছিল।


শেখ রোকন: একদম ঠিক বলেছেন। মাত্র একদিন আগে মুক্তিযুদ্ধ গবেষক হাসান মোরশেদের সঙ্গে কথা হচ্ছিল। তিনি একাত্তরে নদীর এমন দুটি ভূমিকার কথা বলেছেন, যেটা আমি আগে ভাবিনি। যেমন তিনি বললেন, শরণার্থীদের নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে নদী দারুণ ভূমিকা রেখেছে। সড়পথে নানা বিপদ, নদীপথ নিরাপদ। তখন তো সব বাড়িতেই নৌকা থাকতো। নিজেদের মতো করে চলে যেতে পেরেছেন তারা। একবার ড. অজয় রায়ের সাক্ষাৎকার পড়েছিলাম। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি সম্পর্কে। সেখানে তিনি বলছেন, কীভাবে নৌপথে নিরাপদ আশ্রয়ে গিয়েছিলেন তারা। হাসান মোরশেদের আরেকটি পর্যবেক্ষণ আমাকে ধাক্কা দিয়ে জাগিয়ে দিয়েছিল। আমি যদিও আগে লিখেছি যে, রায়ের বাজার বধ্যভূমি বা মিরপুর বধ্যভূমি আসলে বুড়িগঙ্গা বা তুরাগ নদী খাত। আবেগ থেকে লিখেছিলাম, মুক্তিযুদ্ধে যেসব শহিদের লাশের খোঁজ মেলেনি, তাঁরা মিশে আছেন প্রিয় স্বদেশের নদ-নদীতে। কিন্তু হাসান মোরশেদ বললেন যে, দেশের সব নদ-নদীই আসলে বধ্যভূমি। বাঙালিদের হত্যা করে পাকিস্তানীরা নদীতেই লাশ ফেল দিত। তার এই পর্যবেক্ষণ আমাকে নাড়া দিয়েছে।


বিবার্তা: মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব কি নদীর এই ভূমিকা সম্পর্কে সচেনতন ছিল?


শেখ রোকন: অবশ্যই। আপনি যদি বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক সাত মার্চের ভাষণ খেয়াল করেন, দেখবেন তিনি বলছেন ‘আমরা ওদের পানিতে মারবো’। বঙ্গবন্ধু নিজেও আশৈশব নদ-নদীতে সাঁতরে বড় হয়েছেন। তার অসমাপ্ত আত্মজীবনী পড়লে দেখবেন তিনি একাধিক জায়গায় নিজের পরিচয় দিয়েছেন 'পানির দেশের মানুষ' হিসেবে। বঙ্গবন্ধুর দূরদর্শীতা আমরা মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রমাণ হতে দেখেছি। প্রথম দিকের যুদ্ধগুলোতে বিজয় এসেছিল নদী এলাকার যুদ্ধগুলোতে। যেমন সালনা নদীর যুদ্ধ, গোমতি নদীর যুদ্ধ, ব্রহ্মপুত্রের কোদালকাটির যুদ্ধ।


বিবার্তা: রণাঙ্গন পরিকল্পনায় কি নদীর সুবিধা বিবেচনা করা হয়েছিল?


শেখ রোকন: নিশ্চয়ই হয়েছিল। আপনি জানেন, গোটা বাংলাদেশ এগারোটি সেক্টরে বিভক্ত ছিল। এর মধ্যে ১০ নম্বর সেক্টর ছিল দেশের নদ-নদী, বন্দর, সমুদ্রবন্দর ও উপকূলীয় এলাকা। যে কারণে অন্য সব সেক্টরে সেক্টর কমান্ডার থাকলেও ১০ নম্বর সেক্টরে কোনো কমান্ডার ছিল না। আমি অনেক সময় মজা করে বলি, ১০ নম্বর সেক্টরের সেক্টর কমান্ডারের নাম 'নদী'।


বিবার্তা: মুক্তিযুদ্ধে একটি নৌ কমান্ডও তো গঠিত হয়েছিল।


শেখ রোকন: কেবল গঠন হয়নি, তারা অমিত সাহস ও সাফল্যের সঙ্গে লড়াই করেছিল। এই কমাণ্ডের প্রশিক্ষণ হয়েছিল ঐতিহাসিক পলাশীর ময়দানের কাছে ভাগীরথী নদীতে। পলাশী ও ভাগীরথীর ঐতিহাসিক গুরুত্ব বুঝতে পারেন? সেখানে বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলা পরাজিত হয়েছিলেন লর্ড ক্লাইভের কাছে। অবশ্য মীরজাফরের বিশ্বাসঘাতকতা ছাড়া ক্লাইভের পক্ষে ওই যুদ্ধে জয়ী হওয়ার সুযোগ ছিল না। যাহোক, নৌ কমান্ডের প্রশিক্ষণের জন্য ওই স্থান নির্বাচন খুবই তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা মনে হয় আমার কাছে। যে পলাশীতে একদিন বাংলার স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হয়েছিল, সেখানেই স্বাধীনতার সূর্যোদয়ের আয়োজন চলছে, তৈরি হচ্ছে তিন শতাধিক নৌ-কমান্ডো। দারুণ ব্যাপার না! আরেকটি বিষয় লক্ষ্য করুণ, লর্ড ক্লাইভ নৌশক্তিতে সবচেয়ে শক্তিশালী ছিলেন। সিরাজউদ্দৌলা দুর্বল ছিলেন নৌশক্তিতে। আর বাঙালি মুক্তিযোদ্ধারা সেই নৌ কমান্ডোর প্রশিক্ষণ নিয়ে পাকিস্তানীদের নৌ শক্তি ধ্বংস করতে যাচ্ছে।


বিবার্তা: আমাদের নৌ কমান্ডোরা কেমন সাফল্য পেয়েছিল?


শেখ রোকন: ব্যাপক সাফল্য পেয়েছিল নৌ কমান্ডোরা। পাকিস্তানী নৌ শক্তি রীতিমত পর্যদুস্ত হয়ে পড়েছিল। আপনি নিশ্চয়ই অপারেশন জ্যাকপটের নাম শুনেছেন। এটি ছিল নৌযুদ্ধে বাংলাদেশের পক্ষে সফলতম গেরিলা অপারেশন। মে মাসে নৌ কমান্ডো গঠনের পর দেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে পাকিস্তানী বাহিনীর রসদ লাইন ধ্বংস করতে কাজ শুরু করে তারা। একাত্তরের ১৫ আগস্ট রাতের প্রথম প্রহরে চট্টগ্রাম, মংলা সমুদ্র বন্দর এবং চাঁদপুর ও নারায়ণগঞ্জ নদীবন্দরে একযোগে হামলা চালানো হয় অপারেশন জ্যাকপট নামে। এই হামলার সংকেতও ছিল মজার। ভারতের আকাশবাণী রেডিওতে যখন সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় 'আমার পুতুল আজকে প্রথম যাবে শ্বশুরবাড়ি' গানটা গাইবেন, তখন বুঝতে হবে ওই রাতেই হামলা করতে হবে। মজার না?


বিবার্তা: আসলেই খুবই দারুণ ব্যাপার, রোমাঞ্চকর।


শেখ রোকন: পাকিস্তানীদের জন্য অবশ্য রোমাঞ্চকর নয়, আতঙ্ক নিয়ে এসেছিল অপারেশন জ্যাকপট। বাঙালি নৌযোদ্ধারা প্রায় খালি গায়েই হামলা চালায়। এই গেরিলা অপারেশনে পাকিস্তানি বাহিনীর অস্ত্র ও রসদবাহী বেশকিছু জাহাজ ধ্বংস হয়। তার মধ্যে কিছু ভাড়া করা বিদেশি জাহাজও ছিল। ফলে সারাবিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে বাংলাদেশের নৌবাহিনীর সাফল্যের খবর। এর পর বিদেশীরা পাকিস্তানীদের জাহাজ ভাড়া দিতেও অস্বীকার করতে থাকে। তাদের রসদ ও অস্ত্র সরবরাহ বড় রকমের বিঘ্ন ঘটে। অপারেশন জ্যাকপট তাদের মনোবল ভেঙে দেয়।


বিবার্তা: ভারতীয় মিত্র বাহিনী বাংলাদেশের নদ-নদীর বিষয়টি জানতো?


শেখ রোকন: জেনারেল জ্যাকবসহ ভারতীয় মিত্র বাহিনীর অন্যদের এ বিষয়ে সাক্ষাৎকার পড়েছি। তারাও বর্ষাকালের জন্য অপেক্ষার কথা বলেছেন। আপনি দেখবেন, মুক্তিযোদ্ধারা পাকিস্তানী বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রত্যাঘাত শুরু করেছিল জুন-জুলাই মাস থেকে। অর্থ্যাৎ আষাঢ়-শ্রাবণ মাস থেকে। আরেকটি বিষয়, ভারতীয় মিত্র বাহিনীও যে নদীমাতৃক বাংলাদেশে যুদ্ধে খুব বেশি সুবিধা করতে পারতো না, সেটা তারা জানতো। আগে শুধু মুক্তিযোদ্ধারা গেরিলা অপারেশন চালাতো। ভারতীয় বাহিনীর যৌথ আক্রমণ শুরু করে ডিসেম্বরে। অর্থ্যাৎ শীতকালে। ততদিনে গোটা বর্ষাকালজুড়ে গেরিলা অপারেশন চালিয়ে পাকিস্তানী বাহিনীকে কোণঠাসা করে ফেলেছে মুক্তিবাহিনী। পাকিস্তানীরা প্রত্যন্ত এলাকা থেকে ক্যাম্প গুটিয়ে ততদিনে জেলা শহরগুলোতে অবস্থান নিয়েছে।


বিবার্তা: একবার আপনার ফেসবুক পোস্টে বাংলাদেশের নৌযুদ্ধ নিয়ে নিউইয়র্ক টাইমসের সাংবাদিকের রিপোর্টের কথা পড়েছিলাম।


শেখ রোকন: ধন্যবাদ, আপনার সেই কথা মনে আছে দেখে ভালো লাগছে। ভদ্রলোকের নাম সিডনি শনবার্গ। পুলিৎজার পেয়েছিলেন পরবর্তীতে। একাত্তরে যে কয়জন সাংবাদিক বাংলাদেশের অভ্যন্তরের চিত্র বিশ্বের কাছে তুলে ধরেছেন, তিনি তাদের অন্যতম প্রধান। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তার প্রতিবেদনগুলো পরে অনুবাদ হয়ে একটি বই আকারে প্রকাশ পেয়েছিল। বইটি আপনিও কিনতে পারেন, সাহিত্য প্রকাশ বের করেছে। মফিদূল হকের অনুবাদ। নাম 'ডেটলাইন বাংলাদেশ : নাইন্টিন সেভেন্টিওয়ান'।


বিবার্তা: সেখানে তিনি কী বলেছিলেন নদী নিয়ে?


শেখ রোকন: এক বাঙালি অফিসারের সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন। এপ্রিল মাসে নিউ ইয়র্ক টাইমসে ছাপা হয়েছিল। তিনি লিখেছিলেন, আমি পড়ে শোনাচ্ছি বইটি থেকে- 'বাঙালিরা নির্ভর করছে বর্ষা মৌসুমের বৃষ্টির ওপর, কয়েক সপ্তাহের মধ্যে যা শুরু হবে। পূর্ব পাকিস্তানের গ্রামাঞ্চলের জটিল পথ—গাঙ্গেয় ব্রহ্মপুত্র জলধারা ও সহস্র নদীর আঁকিবুঁকি—পশ্চিম প্রদেশের শুষ্ক ও পার্বত্য অঞ্চল থেকে আগত পাঞ্জাবি ও পাঠানদের কাছে অপরিচিত। যখন বর্ষায় নদী ফুলে উঠবে এবং মে থেকে অক্টোবর পর্যন্ত বন্যায় পূর্ব পাকিস্তানের বিস্তীর্ণ এলাকা জলমগ্ন হয়ে পড়বে, তখন এই অপরিচিতি আরও বাড়বে।’ বাঙালি অফিসারকে উদ্ধৃত করেছিলেন এভাবে- ‘আমরা এখন বর্ষার অপেক্ষায় রয়েছি’, বললেন এক বাঙালি অফিসার। ‘তারা পানিকে এত ভয় পায় যে আপনি ভাবতেই পারবেন না এবং আমরা হচ্ছি জলের রাজা। তারা তখন ভারী কামান ও ট্যাংক নিয়ে চলতে পারবে না। প্রকৃতি হবে আমাদের দ্বিতীয় বাহিনী’।


বিবার্তা: নদীর এই ভূমিকা বা দ্বিতীয় বাহিনী হওয়া কি কেবল মুক্তিযুদ্ধের সময়ই?


শেখ রোকন: এই ভূমিকা ঐতিহাসিক কাল থেকেই। বাংলার বার ভূঁইয়ারারা অজেয় ছিল আসলে নদীর কারণে। নদী ঘেরা বলেই মুঘলরা ঢাকায় সুবে বাংলার রাজধানী স্থাপন করেছিল। আপনি দেখবেন, ষাটের দশকেও আমরা শ্লোগান দিচ্ছি 'তোমার আমার ঠিকানা, পদ্মা-মেঘনা-যমুনা'। এর কারণ কী? এর কারণ নদী আমাদের অস্তিত্ব ও আত্মপ্রত্যয়ের অংশ। আমাদের আবহমানকালের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার অংশ।


বিবার্তা: আমরা তো সেই নদী মেরে ফেলছি।


শেখ রোকন: আমার বড় বেদনা সেখানেই। নদীর নানা অবদান রয়েছে। আমি অনেক সময় সংক্ষেপে বলি যে, প্রকৃতি থেকে প্রতিরক্ষা সবক্ষেত্রেই নদী গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সেই নদীগুলোকে আমরা মেরে ফেলছি নির্মমভাবে। প্রবাহস্বল্পতা, দখল, দূষণ, ভাঙন, নির্বিচার বালু উত্তোলনের কারণে আমাদের নদীগুলো নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে। নদী না থাকলে বাংলাদেশের অস্তিত্ব সংকটে পড়বে। আমার খুব দুঃখ হয় এটা দেখে যে, আর কিছু না হোক মুক্তিযুদ্ধে নদীর অবদান আমরা মনে রাখিনি। যে নদীর কারণে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ত্বরান্বিত হয়েছে, স্বাধীন বাংলাদেশ সেই ঋণ শোধ করেনি। এমনকি ভৌগোলিকভাবে নদীর আশীর্বাদে গড়ে ওঠা দেশে নদীগুলোই যেন অভিশপ্ত।


বিবার্তা: মুক্তিযুদ্ধে নদীর ভূমিকা নিয়ে কী করছেন? কী করা দরকার?


শেখ রোকন: আমরা রিভারাইন পিপল থেকে নদী সুরক্ষায় সাধ্যমত চেষ্টা করছি। সেটা তো মূলত পরিবেশবাদী দৃষ্টিভঙ্গী থেকে। সরকারি বা বেসরকারিভাবে যারা মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা সংগ্রাম নিয়ে কাজ করেন, তাদের বরং নদীর প্রতি দৃষ্টি ফেরানো প্রয়োজন। নদীর অন্য অবদান তো আছেই, মুক্তিযুদ্ধের সহযোদ্ধা, বধ্যভূমিকার স্মারক হিসেবেও নদী সুরক্ষায় তাদেরও এগিয়ে আসা দরকার।


বিবার্তা: ধন্যবাদ, আমাদের সময় দেয়ার জন্য।


শেখ রোকন: বিবার্তাকেও ধন্যবাদ, নদীময় শুভেচ্ছা।


বিবার্তা/উজ্জ্বল/আবদাল

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

ময়মনসিংহ রোড, শাহবাগ, ঢাকা-১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: bbartanews24@gmail.com ​, info@bbarta24.net

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com