মানুষের সেবা করা আমার পেশা না, নেশা!
প্রকাশ : ০১ ডিসেম্বর ২০১৯, ১৮:৫৭
মানুষের সেবা করা আমার পেশা না, নেশা!
আদনান সৌখিন
প্রিন্ট অ-অ+

মানুষের সেবা করা আমার পেশা নয়, এটা আমার কাছে এখন নেশার মতো হয়ে গেছে। আমি এর বিনিময়ে কোনো কিছুর প্রত্যাশা করে কাজ করি না, যা করি নিজের মনের একান্ত ইচ্ছা থেকেই করি। খুব কম বয়সে আমি দেশের বাইরে চলে যাই, নিজেকে প্রতিষ্ঠিতও করি। কিন্তু দেশের জন্য কিছু করতে না পারার আক্ষেপ সবসময়ই ছিল।আমার কাছে এটা অনেকটাই অপরাধবোধের মতোই লাগে। সেই তাগিদ থেকে কয়েক মাস পর পরই দেশের মানুষের কাছে ফিরে আসি।


রাজধানীর শাহবাগস্থ বিবার্তার নতুন অফিসে বিবার্তার সাথে একান্ত সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলছিলেন আমেরিকা প্রবাসী চিকিৎসক ও সমাজসেবক ডা. ফেরদৌস খন্দকার। দীর্ঘ আলাপে উঠে এসেছে একজন চিকিৎসকের চিন্তা-চেতনা, সমাজসেবামূলক কাজ এবং চিকিৎসকদের জীবনের বিভিন্ন দিক। দীর্ঘ আলাপচারিতার বিশেষ অংশগুলো বিবার্তার পাঠকদের জন্য এখানে তুলে ধরা হলো।


বিবার্তা: চিকিৎসা পেশার সাথে জড়ালেন কীভাবে?


ডা. ফেরদৌস খন্দকার: কুমিল্লার দেবীদ্বারেআমার জন্ম। এই গ্রামেই কেটে যায় ছেলেবেলার অনেকটা সময়। ১৯৮৭ সালে এসএসসি ও ১৯৮৯ সালে ইন্টারমিডিয়েট পাস করে আমি এমবিবিএস পড়ার সুযোগ পেয়ে যাই চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে। ১৯৯৮ সালে মেডিকেল থেকে পড়াশোনা শেষ করে ১৯৯৯ সালে পাড়ি জমাই আমেরিকায়। কারণ আমার পরিবার সে মুহূর্তে সেখানে বাস করত। এক বছরের মধ্যেই সেখানকার বাসিন্দা হয়ে যাই। ২০০২ সালের মধ্যে মেডিসিন বিষয়ে উচ্চতর প্রশিক্ষণ নিয়ে শুরু করি প্র্যাকটিস। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মেডিকেল জার্নালে আমার বেশ কিছু লেখা প্রকাশিত হয়েছে।



ডা. ফেরদৌস খন্দকার


বিবার্তা : আপনার কর্মব্যস্ততা সম্পর্কে জানতে চাই।


ডা. ফেরদৌস খন্দকার: আমি আমেরিকার কুইন্সে থাকি। এটা জ্যাকসন হাইটস থেকে খুব কাছেই। জ্যাকসন হাইটস বাঙালিদের অন্যতম এক জনপ্রিয় শহর। বাংলাদেশের সব থেকে বেশিসংখ্যক মানুষ এই এরিয়াতে থাকেন। বাংলাদেশী কমিউনিটির কাছে আমার গ্রহণযোগ্যতা খুবই ভাল। সেটা চিকিৎসক হিসেবে যতটা, তার চেয়ে বেশি মানুষ হিসেবে, সমাজ সেবক হিসেবে। কমিউনিটির যে কোনো ধরণের সমস্যায় আমি এগিয়ে আসতে চেষ্টা করি। জ্যাকসন হাইটসে আমার ‘ওয়েস্টার্ন মেডিকেল কেয়ার’ নামে একটি ক্লিনিক আছে। খোলার ২ বছরের মধ্যেই এটি সবার মুখে মুখে চলে আসে। বেশ কয়েকবার এটি নিউইয়র্কের মধ্যে সবচেয়ে ভাল ক্লিনিকের স্বীকৃতি পেয়েছে।


বিবার্তা : বাংলাদেশ নিয়ে ভাবনার কারণ কী?


ডা. ফেরদৌস খন্দকার: আমার সবচেয়ে বড় পরিচয় আমি বাঙালি। এই দেশের মাটিতেই আমার বেড়ে ওঠা। মা-মাটি দুটাই টানে আমাকে ভীষণভাবে। নিজের দেশের জন্য হৃদয়ে অন্যরকম একটা অনুভূতি কাজ করে সব সময়। প্রিয় জন্মভূমিকে ভালোবাসার টানেই আমার স্বপ্ন ছিল দেশের জন্য কিছু করার, সেটা যত ছোট কাজই হোক না কেন। সেই লক্ষেই আমি দেশে আসি। ২০০৬ সাল থেকে নিজের গ্রামে আসতাম এবং ছোট ছোট কিছু জনসেবামূলক কাজ করার চেষ্টা করতাম। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে শুধু এসব ছোট ছোট কাজে বা শুধু চিকিৎসা সেবায় নিজেকে নিয়োজিত রাখলে আমার সব দায়িত্ব শেষ হবে না। মানুষ আমার কাছে থেকে আরো বেশি কিছু আশা করে। মানুষের জন্য আরো অনেক কিছু করার আছে। আর আমি সে কাজগুলোই করতে চাই। এসব চিন্তা-ভাবনা করেই ইদানিং বার বার দেশে আসা ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের কাছে যাবার চেষ্টা করছি।


বিবার্তা: দেশে এখন কী ধরনের চিকিৎসাসেবা দিচ্ছেন?


ডা. ফেরদৌস খন্দকার : ২০০৬ সালে কুমিল্লার দেবীদ্বারের বাজারে ছোট একটি রুম নিয়ে গর্ভবতী মায়েদের বিনামূল্যে ভিটামিন দেয়ার কাজ শুরু করি এবং সেই ভিটামিনগুলো আমি নিজেই আমেরিকা থেকে নিয়ে আসতাম। সেখান থেকেই শুরু। এখন সেখানে আমাদের একটি পাঁচ হাজার স্কয়ারফিটের সুবিশাল হেলথ ক্লিনিক আছে, যা ২০১৪ সাল থেকে আনুষ্ঠানিক কাজ শুরু করে। সেখানে আমি সর্বোচ্চমানের ডাক্তার ও মেডিসিন নিশ্চিত করেছি। প্রতিদিন প্রায় ৪০ থেকে ৫০ জন মানুষ সেখানে সম্পূর্ণ ফ্রিতে চিকিৎসাসেবা নিচ্ছেন। এই ক্লিনিকে প্রতিমাসে বিশেষ কিছু সেবা যেমন দাঁতের চিকিৎসা, চোখের অপারেশন ও টিকা দেয়া হয়ে থাকে। এছাড়া ক্লিনিকের পাশেই আমার একটি এগ্রোফার্ম আছে যেখান থেকে গর্ভবতী মায়েদের বিনামূল্যেদুধ ও ডিম দেয়া হয়।



সেবামূলক একটি কর্মসূচিতে ডা. ফেরদৌস খন্দকার


বিবার্তা : বলছিলেন দেশের জন্য কাজ করতে ভালোবাসেন। চিকিৎসার বাইরে মানবসেবামূলক আর কী কী কাজ করছেন?


ডা. ফেরদৌস খন্দকার : মানুষের জন্য যে কোনো কল্যাণমূলক কাজ করতে পারলেই আমার ভাল লাগে। সেই ভালোলাগা থেকেই আমার এলাকার ছেলে-মেয়েদের শিক্ষা নিয়ে কাজ করছি। পরিকল্পিতভাবে প্রতি বছর এখানকার জেএসি, পিএসসি, এসএসসি পরীক্ষার্থীদের পরীক্ষার ৩ মাস আগে থেকে কোচিং করানো হয়। পাশাপাশি তাদের জন্য এক বেলা খাবারেরও ব্যবস্থা করি। এ পর্যন্ত প্রায় ১ হাজার ৫০০ শিক্ষার্থী এখান থেকে উপকৃত হয়েছে। মেয়ে শিক্ষার্থীদের জন্য একটি অত্যাধুনিক টয়লেট করে দিয়েছি যার খরচ পড়েছে প্রায় পাঁচ লাখ টাকা। এলাকার আশপাশে বেশ কিছু স্কুলে সারাবছর খেলা-ধুলার সামগ্রি সরবরাহ করি। সেখানে আমার একটি খেলার টিম আছে যারা স্থানীয় একটি প্রতিযোগিতায় সেমি ফাইনালে আছে। এতে করে তরুণ প্রজন্ম মাদক ও সন্ত্রাস থেকে দূরে থাকছে। দুঃস্থ মানুষদের সুবিধার জন্য ১০টি হুইল চেয়ার দান করব। এছাড়াও আগামী বছর এলাকার চারটি স্কুল ও কলেজ নিয়ে একটি বিতর্ক প্রতিযোগিতার আয়োজন করার পরিকল্পনা রয়েছে।


আমেরিকার ‘THE OPTIMIST’ নামক একটি এনজিও এর সাথে আমি জড়িত আছি। সেটির মাধ্যমে প্রায় ২০ বছর ধরে বাংলাদেশের প্রায় ২৫টি জেলার ১ হাজার ৪০০ শিশুকে আমরা লেখাপড়া করাচ্ছি। সেটির একটি অংশ হিসেবে কুমিল্লার ৮৫ জন শিক্ষার্থীকে প্রতি বছর মেধাবৃত্তি দেয়া হয়। এছাড়াও মুজিববর্ষের কর্মসূচি হিসেবে আমি ১০০ জন শিক্ষার্থীকে নিয়ে পাঁচ হাজার গাছ লাগানোর একটি উদ্যোগ নিয়েছি। সেটির উপর ১ বছর পরে একটি পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানও করা হবে। আমেরিকার লোকাল জনগণের মধ্যে সিসা বিষক্রিয়া (Lead Poisoning) এর গুরুত্ব বুঝাতে আমরা ক্যাম্পেইন করে থাকি। প্রায় ১০ হাজার মানুষকে এ বিষয়ে আমরা সচেতন করতে সক্ষম হয়েছি। বাংলাদেশী অভিবাসী শিশুরা যারা স্কুলে সদ্য যাচ্ছে তাদের আমরা উৎসাহমূলক বিভিন্ন উপহার দিচ্ছি।


বিবার্তা : তথ্যপ্রযুক্তির যুগে সবাই এখন মুঠোফোনেই পেয়ে যান স্বাস্থ্যসেবার সব প্রয়োজনীয় পরামর্শ। আপনার এ ধরনের কোনো উদ্যোগ রয়েছে কিনা?


ডা. ফেরদৌস খন্দকার : চিকিৎসাসেবাটা আমি ভালোবেসে করি। এটা কখনো ছাড়তে পারব না। দেশে আসলে কিছুটা সময়ের জন্য হলেও সব সময়ই চেষ্টা করি বিনামূল্যে রোগী দেখতে। আপনি জেনে খুশি হবেন যে, যুগের সাথে তাল মিলিয়ে আমিও একটি ইউটিউব চ্যানেল খুলেছি। নাম ‘Dactarbari’ (ডাক্তার বাড়ি)। সেখানে প্রায় পাঁচ লাখ সাবস্ক্রাইবার ও ৫০০+ ভিডিও আছে। সবগুলোই স্বাস্থ্য সচেতনতা নিয়ে। ইউটিউব চ্যানেলটির লিংক হলো- (https://www.youtube.com/channel/UCnQoipGmBRC1XTOUY8c1UdA)। এছাড়া কিছুদিনের মধ্যেই আমি ‘ডাক্তার বাড়িডটকম’ নামে একটি স্বাস্থ্য-বিষয়ক অনলাইন টিভি চ্যানেল খুলতে যাচ্ছি। সেবার পাশাপাশি টুকটাক লেখালেখিও করে থাকি। ডাক্তার বাড়ি-১ নামে একটি বই ইতোমধ্যেই বাজারে আছে। সামনের বই মেলায় আমার আরো ২টি বই বের হচ্ছে। ‘ডাক্তার বাড়ি-২’ এবং ‘ডায়বেটিস নিয়ন্ত্রণ আপনারই হাতে’।



Dactarbari.com নামে ইউটিউব চ্যানেল উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ডা. ফেরদৌস খন্দকার


বিবার্তা : আপনার সুদূরপ্রসারী লক্ষ্যগুলো কেমন হবে?


ডা. ফেরদৌস খন্দকার : প্রফেশনালি দেখলে আমি ডাক্তার আছি, ডাক্তার থাকব। আর মানুষের সেবা সেটাও চালিয়ে যাব, ধীরে ধীরে এর মান বাড়বে, পরিধি বাড়বে। দেশ ও দেশের মানুষ যদি কখনো আমাকে দেশে স্থায়ীভাবে থাকার ও কাজ করার সুযোগ দেয় আমি নির্দ্বিধায় দেশে চলে আসব। ২০২১ সালে মুক্তিযুদ্ধের ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে ‘গৌরব ৭১’ এর সাথে মিলে ‘মুক্তিযুদ্ধ অলিম্পিয়াড’ নামে একটি বড় প্রোগ্রাম করতে যাচ্ছি। সেখানে স্কুল কলেজের শিক্ষার্থীদের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের জ্ঞানের গভীরতার পরীক্ষা হবে। সেখানে ১০ জন বিজয়ীকে সারাদেশের সামনে পরিচয় করিয়ে দেয়া হবে। এছাড়া আমেরিকায় প্রবাসী কমিউনিটির মধ্যে মাদক নিয়ে সামনের ফেব্রুয়ারিতে আমরা একটি বড় ধরনের প্রোগ্রাম করব। মাদকের ভয়াবহতা, সন্তান মাদকাসক্ত হচ্ছে কিনা তা বোঝার উপায়, প্রতিকার এসব বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে।


বিবার্তা : তরুণদের নিয়ে আপনার কোনো পরিকল্পনা রয়েছে কিনা ?


ডা. ফেরদৌস খন্দকার : আসলে আমাদের সব কাজের মূল টার্গেট হচ্ছে তরুণ সমাজটাকে নিয়ে। তাদের নেশা, সন্ত্রাস, অপরাজনীতি থেকে দূরে রাখতে নিজের খরচে আমাদের এলাকার আশপাশে ১৬টি ইউনিয়নে ১৬টি স্পোর্টস ক্লাব করে দেয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এছাড়া আগামী বছরের জুন-জুলাই মাসে এলাকায় একটি ভলিবল টুর্নামেন্টের আয়োজন করতে চাই।



সেবামূলক একটি কর্মসূচিতে ডা. ফেরদৌস খন্দকার


বিবার্তা: আপনি কি হিসেবে নিজেকে ভাবতে পছন্দ করেন?


ডা. ফেরদৌস খন্দকার : আমি নিজেকে সেচ্ছাসেবক হিসেবেই পরিচয় দিতে বেশি পছন্দ করি। এই যে আমার কাজগুলো, এসব আমি ডাক্তার না হলেও করতাম। তবে এই পেশাটা আমাকে মানুষের অনেক কাছে যেতে সাহায্য করেছে। আপনার পাশে বসা মানুষকে যদি আপনি ভাল রাখতে পারেন, তবেই আপনি সফল।


বিবার্তা : দেশের ভবিষ্যৎ ডাক্তারদের জন্য আপনার পরামর্শ কী?


ডা. ফেরদৌস খন্দকার : ভাল ডাক্তার হতে হলে আগে ভাল মানুষ হতে হবে। মানুষকে ভালোবাসতে হবে। এটি এমন একটি পেশা যা আপনাকে টাকা দিবেই, কিন্তু খেয়াল রাখতে হবে যেন টাকার নিচে আপনার মনুষ্যত্ব ঢাকা না পড়ে যায়। মানুষের সেবায় নিজেকে সবসময় নিয়োজিত রাখতে হবে, টাকা বা লাভ লোকসান বিবেচনায় আনা যাবে না।


বিবার্তা/আদনান/উজ্জ্বল/জাই

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

ময়মনসিংহ রোড, শাহবাগ, ঢাকা-১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: bbartanews24@gmail.com ​, info@bbarta24.net

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com