বিবিসির অনুসন্ধানী প্রতিবেদন
তাজমহল কি কখনো হিন্দু মন্দির ছিল
প্রকাশ : ০৪ নভেম্বর ২০১৭, ১০:৫৭
তাজমহল কি কখনো হিন্দু মন্দির ছিল
বিবার্তা ডেস্ক
প্রিন্ট অ-অ+

ভারতের এক এমপি ও কিছু ডানপন্থী গোষ্ঠী দাবি করেছে, তাজমহল একটি হিন্দু মন্দির ছিল। ক্ষমতাসীন দল ভারতীয় জনতা পার্র্টির (বিজেপি) বিনয় কাটিয়ার সরকারের কাছে তাজমহলের নাম বদলে দেয়ার দাবি জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, একজন হিন্দু শাসক তাজমহল তৈরি করেছেন।


ভারতের গণমাধ্যমে তার এই দাবি ব্যাপক প্রচার পায়। অনেক ডানপন্থী গোষ্ঠী তার এই দাবি সমর্থন করে।


বিবিসির 'রিয়েলিটি চেক' অনুসন্ধানে বলা হয়েছে, এই দাবির পক্ষে বিশ্বাসযোগ্য কোন প্রমাণ নেই। বরং ইতিহাসবিদদের বিরাট সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ, এমনকি ভারত সরকার পর্যন্ত মনে করে, এই সৌধ ইন্দো-ইসলামিক স্থাপত্যের এক চমৎকার নিদর্শন।


তাজমহল কে তৈরি করেছে? ভারতের সরকারিভাবে সংরক্ষিত ইতিহাস অনুযায়ী, মোগল সম্রাট শাহজাহান তাজমহল তৈরি করেছিলেন তার প্রিয়তমা স্ত্রী মমতাজ মহলের স্মরণে।


ভারতের মোগল শাসকরা এসেছিল মধ্য এশিয়া থেকে। ষোড়শ এবং সপ্তদশ শতকে তারা ভারত শাসন করেন। মোগল শাসনামলে দক্ষিণ এশিয়ায় ইসলাম সুপ্রতিষ্ঠিত হয়। পুরো ভারতবর্ষ জুড়ে ইসলামী শিল্পকলা ও সংস্কৃতির প্রসার ঘটে।


শিল্পকলা ও স্থাপত্যের ব্যাপারে মোগলদের যে অনুরাগ, তার সবচেয়ে বড় নিদর্শন বলে গণ্য করা হয় তাজমহলকে। ভারতের প্রত্নতত্ত্ব জরিপ বিভাগ তাজমহলকে বর্ণনা করেছে 'মোগল স্থাপত্যকলার চূড়ান্ত নিদর্শন' হিসেবে।


তাজমহল নিয়ে ভারত সরকারের ওয়েবসাইট বলা হয়েছে, ইসলামী স্থাপত্যকলার সঙ্গে ভারতের স্থানীয় স্থাপত্যকলার সংমিশ্রণে গড়ে উঠা সে সময়ের স্থাপত্য রীতির সবচেয়ে উৎকৃষ্ট উদাহারণ এটি।


এতে আরও বলা হয়, মোগলরা যখন তাজমহলের নির্মাণ কাজ শেষ করে, তখনও তারা তাদের পারস্য এবং তুর্কী-মোঙ্গল শেকড় নিয়ে গর্ব অনুভব করত। কিন্তু ততদিনে তারা একই সঙ্গে নিজেদের ভারতীয় বলেও ভাবতে শুরু করেছে।


ইতিহাসবিদ রানা সাফভি বিবিসিকে বলেন, তাজমহলের ইতিহাস নতুন করে লেখার কোন প্রশ্নই উঠতে পারে না। সেখানে যে কখনো কোন মন্দির ছিল তার কোন প্রমাণ নেই।


তিনি আরও বলেন, তাজমহল তৈরি হওয়ার আগে সেখানে হিন্দু শাসক জয় সিংয়ের একটি প্রাসাদোপম বাড়ি ছিল। শাহজাহান এই বাড়িটি জয় সিংয়ের কাছ থেকে কিনে নেন। এ নিয়ে একটি 'ফরমান' জারি করা হয়েছিল। সেটা এখনো আছে। এই ফরমানে দেখা যায়, মোগলরা তাদের বিভিন্ন চুক্তি এবং ইতিহাস রক্ষায় বেশ সচেতন ছিলেন।


রানা বলেন, ডাব্লিউ ই বেগলি এবং জেড এ ডেসাহাসের লেখা একটি বইতে এসব দলিল সংকলন করা আছে। এসব বই পড়ে আমি উপলব্ধি করি, এসব ভবন ও সৌধের ইতিহাস কত ভালোভাবে সংরক্ষণ করা হয়েছে। এই বই পড়েই আমি যুক্তি দিতে পারি যে, তাজমহল তৈরি হয়েছে জয় সিংয়ের বাড়ির জমির ওপর এবং সেখানে কোন ধর্মীয় ভবন থাকার কথা উল্লেখ কোথাও নেই।


আরেকজন বিখ্যাত ইতিহাসবিদ হারবনস মুখিয়াও রানার সঙ্গে একমত। তিনি বলেন, শাহজাহান যে তার স্ত্রীর স্মরণে তাজমহল নির্মাণ করেছিলেন এ নিয়ে কোন সন্দেহের অবকাশ নেই।


মন্দির তত্ত্ব:


তাজমহলের ইতিহাস নতুন করে লেখার দাবি বিনয় কাটিয়ারই যে প্রথম জানিয়েছেন তা নয়। এর আগে ডানপন্থী ইতিহাসবিদ পিএন ওক ১৯৮৯ সালে প্রকাশ করা ‘তাজমহল: দ্য ট্রু স্টোরি' বইতে এই সৌধকে ‘তেজো মহল' বলে দাবি করেন। বইতে তিনি যুক্তি দিয়েছেন, এটি ছিল আসলে একটি হিন্দু মন্দির এবং একজন রাজপুত শাসক এটি তৈরি করেন। ওক মনে করেন, সম্রাট শাহজাহান এটি দখল করে সেটিকে পরে তাজমহল নাম দিয়েছেন।


লেখক সচ্চিনানন্দ শেভদে ইতিহাসবিদ পিএন ওকের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেছেন। তিনি বিবিসির মারাঠী সার্ভিসকে বলেন, সরকারের উচিত 'প্রকৃত সত্য' উন্মোচনের জন্য একটি দল নিয়োগ করা। তিনি দাবি করেছেন, তাজমহল কোন মুসলিম স্থাপত্য নয়। এটি আসলে একটি হিন্দু স্থাপত্য।


স্থাপত্য রীতি:


কাটিয়ার ও শেভডদ উভয়েই যুক্তি দেখিয়েছেন, তাজমহলের স্থাপত্যে অনেক হিন্দু স্থাপত্যের ছাপ রয়েছে। তাজমহলের শীর্ষে একটি অর্ধাকৃতি চাঁদ আছে। ইসলামিক স্থাপত্যে এই চাঁদটি সাধারণত বাঁকা থাকে। কিন্তু তাজমহলের চাঁদ বাঁকা নয়। এই চাঁদ আসলে হিন্দু দেবতা শিবের সঙ্গে সম্পর্কিত।


তারা আরও বলেন, এছাড়া এই সৌধ চূড়ায় একটি কলসও আছে। সেখানে আমের পাতা এবং উল্টে রাখা নারকেলও আছে। এগুলো হিন্দু প্রতীক। ইসলামী সংস্কৃতিতে পশুর প্রতিকৃতি নিষিদ্ধ। কিন্তু তারপরও তাজমহলে এসব ব্যবহার করা হয়েছে।


তবে মুখিয়া এসব দাবি প্রত্যাখ্যান করে বলেছেন, স্থাপত্য রীতি সব সময় বদলায় এবং সেখানে বহু সংস্কৃতির প্রভাব পড়ে। মোগল স্থাপত্যকলাও এর ব্যতিক্রম নয়। কলস হিন্দু স্থাপত্যরীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। কিন্তু অনেক মোগল স্থাপত্যেও এটি দেখা যায়, তাজমহলেও রয়েছে।


এখন কেন এই বিতর্ক:


ভারতে যখন হিন্দু জাতীয়তাবাদের উত্থান ঘটছে, তখন বিনয় এমন একটা বিতকির্ত দাবি তুলেছেন। ২০১৪ সালে ভারতে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর থেকে দলটির রাজনীতিকরা ‘হিন্দু শ্রেষ্ঠত্ব' প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছেন। এ ধরণের বিতর্কিত দাবি একই সঙ্গে রাজনীতিকদের একটা সুযোগ করে দেয় কর্মসংস্থান বা অর্থনীতির অবস্থার মতো বাস্তব ইস্যু থেকে জনগণের দৃষ্টি অন্যদিকে সরাতে।


যদিও সরকার এখনো পর্যন্ত তাজমহল বিষয়ক এই দাবিকে সমর্থন করেনি। ডানপন্থী হিন্দু একটি গোষ্ঠী এমন দাবিও তুলেছে, তাজমহলে হিন্দুদের পুজা করতে দিতে হবে।


বিবার্তা/জাকিয়া

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: bbartanational@gmail.com, info@bbarta24.net

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com