ভারতে প্রতি বছর ৫০ হাজার বাংলাদেশি নারী পাচার হয়
প্রকাশ : ১৩ জানুয়ারি ২০১৮, ১২:৫৪
ভারতে প্রতি বছর ৫০ হাজার বাংলাদেশি নারী পাচার হয়
কলকাতা প্রতিনিধি
প্রিন্ট অ-অ+

ভারতেপ্রতি বছর প্রায় ৫০ হাজার বাংলাদেশি তরুণী পাচার হয়ে যাচ্ছে। গত এক দশকে অবৈধভাবে ভারতে পাচার হয়েছে প্রায় ৫ লাখ নারী ও শিশু, যাদের বয়স ১২-৩০ বছরের মধ্যে। সংখ্যাটা সত্যিই অবাক করে দেয়ার মতো।


এনজিও এবং বিভিন্ন সূত্র মারফত প্রাপ্ত তথ্যের ওপর ভিত্তি করে বিএসএফের একটি জরিপে এই ছবি উঠে এসেছে। জানা গেছে, বাংলাদেশ থেকে ভারতে মানব পাচারের প্রবণতা দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে এবং সীমান্তের উভয় পারে অত্যন্ত সক্রিয় থাকা দালালদের চাহিদা ও যোগানের ওপর ভিত্তি করেই রমরমিয়ে চলছে এই ব্যবসা।


বিএসএফ বলেছে, ভারতের বিভিন্ন শহর ও রাজ্যে অবস্থিত মানব পাচারকারী সিন্ডিকেটগুলোর তরফে বাংলাদেশে থাকা পাচারকারী সিন্ডিকেটের দালালদের কাছে তাদের চাহিদার কথা জানায়। এটা কখনো সরাসরি বা কখনো কলকাতায় এজেন্টদের মাধ্যমে সেই চাহিদার কথা জানিয়ে দেয়া হয় বাংলাদেশে। এরপর চাহিদা অনুযায়ী বাংলাদেশে থাকা পাচারকারী চক্রের তরফে নারী-তরুণী-শিশু সরবরাহ করা হয়।


ভারতীয় সিন্ডিকেটের চাহিদা থাকে মূলত অল্পবয়সী তরুণীরা, যাদের পতিতালয়, নিম্নমানের হোটেলে বেশ্যাবৃত্তি, ড্যান্সবার, ম্যাসাজ পার্লার, পরিচারিকা কিংবা অদক্ষ বা আধা-দক্ষ শ্রমিকের কাজে লাগানো হয়।


বিএসএফ জানিয়েছে, চাহিদা পূরণ করতে ঢাকা থেকে শুরু করে পুরো বাংলাদেশেই দালালদের একটা শক্ত নেটওয়ার্ক রয়েছে। যেটা শেষ হয়েছে সীমান্তবর্তী জেলাগুলোর একেবারে শেষ গ্রাম পর্যন্ত। নিজেদের কাজের সুবিধার খাতিরেই সীমান্তবর্তী ওই গ্রামগুলোর মানুষদের সঙ্গে খুব ভাল সম্পর্ক রয়েছে দালালদের। ‘এজেন্ট ও সাব-এজেন্ট’ দালালরা মূলত এই দুইটি ভাগে কাজ করে। এই দালালদের মধ্যে ৮৪ শতাংশই হল পুরুষ, বাকি ১৬ শতাংশ দালাল নারী।


মানব পাচার চক্রের মোডাস অপারেন্ডি (কার্যপ্রণালী) সম্পর্কে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বিএসএফের তরফে বলা হয়েছে, বাংলাদেশি পাচারকারী সিন্ডিকেটের তরফে সীমান্তে বসবাসকারী মানুষদের ভাল চাকরি, ঘরের কাজ, বিবাহের মিথ্যা প্রতিশ্রুতি, চলচ্চিত্রে কাজের সুযোগ প্রদানের মাধ্যমে ভারতে তাদের জীবনকে আরো উন্নত করার প্রলোভন দেখানো হয়ে থাকে। সিন্ডিকেটের প্রথম লক্ষ্যই থাকে প্রধানত সেদেশের (বাংলাদেশের) গরিব ও অসহায় পরিবারের তরুণীরা।


বিএসএফের তরফে আরো জানানো হয়েছে, বাংলাদেশ থেকে নারী, তরুণীদের বেশির ভাগটাই যশোর এবং সাতক্ষীরা সীমান্ত দিয়ে উত্তরচব্বিশ পরগনা জেলার ঘোজাডাঙ্গা দিয়ে ভারতে প্রবেশ করছে। কারণ এই অঞ্চল দিয়ে সীমান্ত পুরোপুরি অরক্ষিত এবং মানুষরাও জিরো লাইনে বসবাস করেন। ফলে খুব সহজেই দালালরা সীমান্তের ওপার থেকে ভারতে মানব পাচার করতে পারে। এর পাশাপাশি দক্ষিণ-পশ্চিম ট্রানজিট পয়েন্ট হিসাবে পরিচিত বেনাপোল সীমান্তও ব্যবহার করছে দালালরা। এর কারণ ভারতে প্রবেশের ক্ষেত্রে এই স্থলবন্দর পথটিই সবচেয়ে সহজতর।


এর পাশাপাশি কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, নিলফামারী, পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও, দিনাজপুর, নওগাঁ, চাপাইনবাবগঞ্জ ও রাজশাহীসহ বাংলাদেশের অন্য জেলাগুলোর সীমান্ত এলাকাও মানবপাচারের জন্য ব্যবহার করে থাকে। বছরের পর বছর ধরে বাংলাদেশের পাচার চক্রের সঙ্গে জড়িত দালালরা এই অঞ্চলে শক্ত ঘাঁটি তৈরি করেছে এবং এইমুহুর্তে এই পথগুলোই পাচারের জন্য সবচেয়ে প্রিয় ‘ট্রানজিট পয়েন্ট’ হয়ে উঠেছে।


সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে পাচারের পরই পাচারকৃত ওই নারী, তরুণী বা শিশুদের ভারতীয় পাচার চক্রের হাতে তুলে দেয়া হয় না। তাদের সীমান্তবর্তী গ্রামেই কিছুদিনের জন্য রেখে দেয়া হয়। এরপর সময়-সুযোগ বুঝে ভারতের অন্য শহরগুলোতে তাদের পাঠিয়ে দেয়া হয়। সেক্ষেত্রে তাদের সবচেয়ে চাহিদা রয়েছে ভারতের মুম্বাই, হায়দরাবাদ ও বেঙ্গালুরু শহরে। পাশাপাশি রায়পুর ও সুরাটেও এই পাচারকৃত নারীদের বেশ চাহিদা রয়েছে।


ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ড ব্যুরোর একটি রিপোর্টে দেখা গেছে, গত বছর প্রায় ২০ হাজার নারী ও শিশু ভারতে পাচার হয়ে এসেছে। যেটা ২০১৫ সালে পাচারকৃত নারী ও শিশুর সংখ্যার চেয়ে শতকরা ২২ ভাগ বেশি।


বাংলাদেশ ও নেপালের সঙ্গে অরক্ষিত সীমান্ত হওয়ার কারণে পশ্চিমবঙ্গে সবচেয়ে বেশি নারী ও শিশু পাচার হয়ে থাকে। পশ্চিমবঙ্গের সীমান্তবর্তী জেলা মুর্শিদাবাদ, উত্তর দিনাজপুর, দক্ষিণ দিনাজপুর, নদীয়, মালদা এবং কোচবিহার অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। বাংলাদেশি তরুণীদের জন্য এটাই ট্রানজিট পয়েন্ট হিসাবে বিবেচিত হয়ে আসছে।


পশ্চিমবঙ্গের পরেই শিশু পাচারের দিক থেকে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে রাজস্থান। অন্যদিকে নারী পাচারের ক্ষেত্রে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে মহারাষ্ট্র।


বিবার্তা/ডিডি/জাকিয়া

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: bbartanational@gmail.com, info@bbarta24.net

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com