হাজারো কষ্টে স্বজনের অপেক্ষা
প্রকাশ : ০৬ অক্টোবর ২০১৮, ১৬:৩৭
হাজারো কষ্টে স্বজনের অপেক্ষা
খলিলুর রহমান
প্রিন্ট অ-অ+

গেইট বন্ধ করে দাঁড়িয়ে আছে আনসার পুলিশ। গেটের ওপরে লেখা - ‘বিনা অনুমতিতে প্রবেশ নিষেধ’। এর মধ্যেই মশার কামড় ও অসহনীয় গরমের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছেন অনেকেই। করছেন ভেতরে প্রবেশের চেষ্টা। কেউ সফল হচ্ছেন, কেউ বা নয়।


এমন দৃশ্য দেখা গেছে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটের (আইসিইউ) সামনে।


আইসিইউ-সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকরা জানান, স্পর্শকাতর এ ওয়ার্ডটিতে চিকিৎসাধীন প্রতিটি রোগী জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে থাকেন। ফলে তাদের নিবিড় পরিচর্যার জন্য পর্যাপ্তসংখ্যক নার্স ও যখন-তখন মূল্যবান ওষুধ-ইনজেকশন ইত্যাদির প্রয়োজন হয়। তবে সরকারিভাবে ওষুধের অপ্রতুলতার কারণে রোগীর নিবিড় পরিচর্যা ও বাইরের ফার্মেসি থেকে প্রয়োজনীয় ওষুধপত্র কিনে আনতে হয়। তাই রোগীর স্বজনদেরও ওয়ার্ডের আশপাশ এলাকায় থাকতে হয়।


রোগীর স্বজনরা জানান, নার্সসংকটের কারণে রোগীর সেবা করতে ডাক্তাররা যখন-তখন ভেতরে ডেকে পাঠান। অনেক সময় স্লিপ হাতে ধরিয়ে বাইরে থেকে দ্রুত ওষুধ-ইনজেকশন কিনে আনতে বলেন। তাই গেইটের বাইরেও নানা দুশ্চিন্তার মধ্যে থাকতে হয় তাদের।



এদিকে, সম্প্রতি আইসিইউ-র সামনে দিয়ে দেখা গেছে, কয়েকটি চেয়ার রাখা আছে। সেখানে বসে আছেন রোগীর স্বজনরা। শুধু চেয়ারই নয়, আইসিইউর সামনের ফাঁকা জায়গাও দখল করে নিয়েছেন তারা। এর মধ্যে কেউ কেউ বিছানা পেতে শুয়েও পড়েছেন। তাদের অনেকেই দীর্ঘ দিন থেকে সেখানে অবস্থান করছেন। পরিস্থিতি এমন হয়েছে, আইসিইউর সামনের অংশ কারো-কারো বাসা-বাড়ির মতোই হয়ে গেছে।


রোগীর স্বজনরা জানান, ওয়ার্ডে বা কেবিনে রোগীর সঙ্গে থাকার নিয়ম রয়েছে। কিন্তু আইসিইউতে এমন নিয়ম না থাকায় তাদের বাইরে থাকতে হয়। বিশেষ করে রোগীর প্রয়োজনেই তাদের বাইরে হলেও থাকতেই হচ্ছে বলে জানিয়েছেন কুমিল্লার বাসিন্দা আল আমিন।


তিনি বিবার্তাকে জানান, তার শ্যালক চিকিৎসাধীন থাকায় প্রায় ১৫ দিন থেকে আইসিইউ'র বাইরে অবস্থান করছেন তিনি। এজন্য তিনি আইসিইউ ইউনিটের বারান্দায় বিছানা করে নিয়েছেন।


শুধু আল আমিনই নন, তার মতো আরো অনেকেই আছেন একইভাবে। গোপালগঞ্জের বাসিন্দা মোহাম্মদ গৌছ উদ্দিন জানান, তার বন্ধু মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হন। পরে স্থানীয় হাসপাতাল থেকে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। ঢামেকে আনার পর অবস্থার অবনতি হলে তাকে আইসিইউতে ভর্তি করা হয়। তাই তিনি ও রোগীর স্বজনরা আইসিইউর বাইরে অবস্থান করেছেন।


এমন অবস্থায় রোগীর অপেক্ষমান স্বজনদের কষ্টের শেষ নেই। বাইরে বসার জায়গা যথেষ্ট নয়। আছে একটিমাত্র টয়লেট রয়েছে, সেটিও চরম নোংরা, দুর্গন্ধে সামনে যাওয়া দায়। এ কারণে অনেক দর্শনার্থী বিশেষ করে মহিলারা ঘণ্টার পর ঘণ্টা প্রস্রাব-পায়খানা না করে থাকতে বাধ্য হন বলে জানিয়েছেন আইসিইউ’র প্রবেশপথে অপেক্ষমান শতাধিক দর্শনার্থী।



রোগীর স্বজনরা জানান, জীবনমৃত্যুর সন্ধিক্ষণে থাকা রোগীকে নিয়ে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত থাকেন তারা। ঘন্টার পর ঘন্টা নাওয়া-খাওয়া ভুলে গেটের বাইরে অপেক্ষা করতে হয় তাদের। এ সময় তাদের অনেকেরই টয়লেটে যাওয়ার প্রয়োজন হলেও বেহাল অবস্থার কারণে যেতে পারেন না।


আমাদের মেডিকেল প্রতিনিধি বুলবুল চৌধুরী। তিনি কয়েক যুগ থেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সাংবাদিকতা করছেন। কর্মক্ষেত্রের সেই অভিজ্ঞার আলোকে তিনি বলেন, আইসিইউ চিকিৎসার শেষ আশ্রয়স্থল। সেখান থেকে রোগীরা খুব কমই ফিরে যান। তখন রোগীর স্বজনদের সান্তনা দেয়ার ভাষা থাকে না। আবার অনেকেই আইসিইউ থেকে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেন। তখন রোগীর স্বজনদের আনন্দেও পাল্লাটা ভারি হয়ে ওঠে।


আইসিইউর বাইরের পরিবেশ সম্পর্কে ষাটউর্ধ্ব ওই সংবাদকর্মী বলেন, আইসিইউর পাশে রোগীর স্বজনদের জন্য আলাদা কোনো রুম নেই। তাই তারা বাইরে অবস্থান করেন। এতে বাইরের পরিবেশটাও নোংরা হয়ে যায়। অনেক সময় নোংরা পরিবেশের উপর গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশ হলে কর্তৃপক্ষ একটু নজর দেয়। কিন্তু এ নজরদারিও সাময়িক।


আইসিইউ সম্পর্কে জানতে চাইলে ঢামেক হাসপাতালের এনেসথেইসওলজী বিভাগের অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান ডা. মো. আব্দুর রহমান বলেন, আমাদের হাসপাতালে কম খরচে আইসিইউ চিকিৎসা পাওয়া যায়। তাই এখানে একটি বেড পেতে রোগীদের লম্বা লাইন লেগে থাকে।


আইসিইউতে ভর্তি সকল রোগীই মুমূর্ষু থাকেন জানিয়ে তিনি বলেন, আইসিইউ থেকে রোগী হয় ভালো হয়ে বের হন, না হয় লাশ হয়ে। ফলে ইচ্ছে করলেই এখানে কাউকে বেড দেয়া সম্ভব হয় না। তবে যখন কোনো রোগী জীবনমৃত্যুর সন্ধিক্ষণ থেকে প্রাণে বেঁচে আইসিইউ থেকে সুস্থ হয়ে বাড়ি যান, তখন স্বজনদের মতো আমাদেরও ভালো লাগে।


অনেকেই প্রাইভেট হাসপাতালে সর্বস্ব খুইয়ে সর্বশেষ ঢামেকে ছুটে আসেন জানিয়ে তিনি বলেন, আইসিইউর চিকিৎসা খুবই ব্যয়বহুল। ফলে সরকারিভাবে সব ওষুধ সরবরাহ করা সম্ভব হয় না। তবুও সাধ্যের মধ্যে যতটুকু পারা যায় ততটুকু বিনামূল্যে সরবরাহ করা হয়।


বিবার্তা/নানা/খলিল/হুমায়ুন/মৌসুমী

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: bbartanational@gmail.com, info@bbarta24.net

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com