একলামশিয়া বা প্রি-একলামশিয়ার কারণে সংকটময় গর্ভবতী মায়ের জীবন
প্রকাশ : ০৬ নভেম্বর ২০১৯, ১০:৫৬
একলামশিয়া বা প্রি-একলামশিয়ার কারণে সংকটময় গর্ভবতী মায়ের জীবন
সামসুন্নাহার বিনু
প্রিন্ট অ-অ+

জন্মের ৩ দিন পরে নবজাতক মেয়েকে নিজের করে পেলেন প্রসূতি মা নিবেদিতা মজুমদার (৩১)। শারীরিক অসুস্থতার কারণে নিবেদিতাকে ৩ দিন আইসিইউতে থাকতে হয়েছে। তাই এ বিরহে ব্যাকুল ছিল মায়ের প্রাণ। মেয়েকে কোলে নিয়ে পরম শান্তিতে বুকের দুধ খাওয়াচ্ছেন মা।


প্রশান্তির পরশে ঝলমল করছে মায়ের মুখ। এবার হাসিমুখেই বলতে শুরু করলেন গত ২ মাস ধরে গর্ভাবস্থায় পার করা জীবনের সংকটময় দিনগুলোর কথা। ৮ মাসের সময় হঠাৎ করেই শুরু হয় শ্বাসকষ্ট। সাথে উচ্চরক্তচাপ ভয় পেয়ে গেলেন স্কুল শিক্ষক নিবেদিতা ও তার পরিবার।


যেখানে নিজের জীবন হুমকির মুখে সেখানে তার প্রতীক্ষা একটি সুস্থ সন্তানের। সাথেই সাথেই স্মরণাপন্ন হলেন চিকিৎসকের। ডাক্তারের পরামর্শেই প্রথমে চট্টগ্রাম মেডিকেল সেখান থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রসূতি ও গাইনী বিভাগে। মা ও সন্তানের সুস্থতার জন্য প্রায় ১৫ দিন থাকতে হলো এ হাসপাতালে। সুস্থ সন্তান নিয়ে এবার নোয়াখালীর মাইজদির প্রিয় আবাস্থলে ফেরার অপেক্ষা। নিবেদিতার মতো এ রকম আমাদের দেশের অনেক গর্ভবতী মাকে প্রি-একলাশিয়ার কারণে জীবন সংকটের মুখোমুখী হতে হয়।


একলামশিয়া বা প্রি একলামশিয়া গর্ভাবস্থায় ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থা। এটি মাতৃমৃত্যু রক্তকারণ। একলামশিয়া কেবল শিশু মৃত্যু নয় একজন মায়ের একলামশিয়া মানে প্রসবকালীন মৃত্যুর প্রধান একটি কারণ। আমাদের দেশে গর্ভবতী নারীরা যে সব মারাত্মক সমস্যার সম্মুখীন হন তার মধ্যে অন্যতম এই প্রি-একলামশিয়া। এটি সাধারণত গর্ভাবস্থার তৃতীয় বা শেষ ভাগে হয়ে থাকে। প্রি-একলামশিয়ার জন্য ঝুকিপূর্ণ হলে উচ্চরক্ত চাপ, স্থূলতা, ডায়াবেটিস, অধিক বয়সে গর্ভধারণ। যমজ বাচ্চা ধারণ তাছাড়া পর্যাপ্ত বিশ্রাম ও ঘুম না হওয়া অত্যাধিক দুশ্চিন্তা করা, ভারী কাজ করা ইত্যাদি কারণে মায়ের রক্তচাপ বৃদ্ধি পায় যা পরবর্তী সময়ে প্রি-একলামশিয়তে রূপ নিতে পারে।


পড়ন্ত বিকেলে প্রসূতি ও গাইনি বিভাগের বারান্দায় বিষণ্নমুখে পায়চারি করছেন ৯ মাসের অন্তঃসত্ত্বা জামালপুরের সাবিকুন্নাহার (২৮)। কিছু দিন ধরেই হাত-পা ফুলে যাচ্ছে এবং রক্তচাপ বেড়েছে। মাঝে মাঝে খিচুনি হয়। মাঝখানে একদিন বেশি অসুস্থ হয়ে পড়লে জামালপুর থেকে তাকে বঙ্গবন্ধু বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়ে আসা হয়। প্রায় ১০ দিন হল এখানে ভর্তি হয়েছেন। কথা বলতে বলতেই জানা গেল তার বিষণ্নতার কারণ। ২ বছর আগে প্রসবের সময় প্রথম বাচ্চাটা পেটেই মারা যায়। সেই হারানোর ভয় এবারো মনের কোনে উকি দিচ্ছে বার বার। যদিও এখন পর্যন্ত শারীরিক অবস্থা ভালো আছে। ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী চলছে সব কিছু। নতুন দিনের আশায় সব কিছু ভুলে নতুন স্বপ্নের জাল বুনছেন অন্তঃসত্ত্বা মা। মনে মনে মহান আল্লাহর কাছে একটাই প্রার্থনা একটি সুস্থ সন্তান।


বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার মতে, প্রি-একলামশিয়া বা একলামশিয়া পৃথিবীতে মাতৃমৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ। সমগ্র বিশ্বে প্রতি বছরই প্রায় পাঁচ লাখ নারী গর্ভজনিত জটিলতায় মারা যান। এর মধ্যে শতকরা নব্বই ভাগ মৃত্যুই ঘটে উন্নয়নশীল দেশসমূহে। প্রসবকালীন জটিলতার কারণে বাংলাদেশে প্রতি ঘণ্টায় তিনজন মা মারা যান। আর এই মাতৃমৃত্যুর এক তৃতীয়াংশ ঘটে প্রসব পূর্ববর্তী সময়ে এবং অধিকাংশই ঘটে নিজ বাড়িতে।


প্রি-একলামশিয়া হচ্ছে ইউরিনে প্রোটিন নির্গত হওয়া এবং উচ্চরক্তচাপ, গর্ভাবস্থার শতকরা ৫ থেকে ১০ ভাগ মহিলারা উচ্চ রক্তচাপজনিত সমস্যায় আক্রান্ত হন। এ সময় গর্ভবতী মায়ের উচ্চ রক্তচাপ ১৪০ থেকে ৯০ সিসি অব মারকারির চেয়ে বেড়ে যায়। এই অবস্থাকে বলা হয় একলামশিয়া। এটি মারাত্মক ধরনের এক প্রকার খিচুনি রোগ। এই রোগে মা ও শিশু উভয়েরই জীবনের আশঙ্কা থাকে। আর একলামশিয়া রোগ দেখা দেয়ার পূর্বের লক্ষণগুলোকে প্রি–একলামশিয়া বলা হয়।


প্রি-একলামশিয়ার হাত থেকে রক্ষা পেতে হলে প্রথমে রোগীকে সচেতন হতে হবে এবং প্রি-একলামশিয়া হওয়ার যেসব সম্ভাব্য কারণগুলো আছে সেগুলোর মধ্যে যদি একটিও রোগীর মাঝে দেখা যায় তবে সাথে সাথে ডাক্তারের সঙ্গে পরামর্শ করতে হবে। অনেক সময় দেখা যায় গর্ভাবস্থার কারণে উচ্চরক্তচাপ অথবা ডায়বেটিস দেখা দেয়। আবার কখনো অল্পমাত্রার উচ্চ রক্তচাপ বেড়ে গিয়ে জটিল অবস্থার সৃষ্টি করে। আর তাই গর্ভবতীকে গর্ভকালীন পুরো সময়টাই একজন ডাক্তারের কাছে নিয়মিত চেকআপ করাতে হবে।


আর তাই গর্ভধারণ ও প্রসবজনিত জটিলতার হাত থেকে বাঁচতে হলে সকলের মাঝে গণসচেতনতা সৃষ্টি করা বিশেষভাবে জরুরি। এভাবে একজন গর্ভবতী এবং পরিবারের সকলের মাঝে সচেতনতা সৃষ্টি হলে যে কোনো রকম জটিলতা এবং একলামশিয়া ও প্রি-একলামশিয়ার মত মারাত্মক রকমের জটিলতার হাত থেকে রক্ষা পাওয়া এবং সর্বোপরি দেশে মাতৃমৃত্যুর হার কমিয়ে আনা সম্ভব বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।


বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রসূতি ও গাইনী বিভাগের আবাসিক চিকিৎসক নার্গিস ইসলাম বলেন, আমাদের দেশের বেশিরভাগ নারী গর্ভকালীন সময়ে ঠিকমতো চেকআপ করান না। স্বাস্থ্যের অবনতির দিকটাকেও যথাযথ গুরুত্ব দেন না। এদের ক্ষেত্রে প্রি-একলামশিয়া ঘটার সম্ভাবনা খুব বেশি থাকে। যা মা ও বাচ্চা উভয়ের জন্যই ক্ষতিকর। এ সময় কিছু লক্ষণ দেখা যেতে পারে যেমন মুখ, হাত-পা বা সারা শরীর ফুলে যাওয়া, প্রচণ্ড মাথা ধরা, চোখে ঝাপসা দেখা। এসব ক্ষেত্রে মাকে দ্রুত নিকটস্থ হাসপাতালে নিতে হবে। যথাসময়ে চিকিৎসা না হলে খিচুনি বা একলামশিয়াতে রূপ নিতে পারে যা খুবই বিপজ্জনক। এতে মায়ের প্রচুর রক্তক্ষরণ, গুরুত্বপূর্ণ অর্গান ফেইলিওরসহ জটিল অবস্থার সৃষ্টি হয়। এমনকি মা ও বাচ্চা উভয়েরই মৃত্যুঝুঁকি থাকে।


তাই প্রি-একলামশিয়া প্রতিরোধ করতে নিয়মিত গর্ভবতী মায়ের চেকআপ করাতে হবে। গর্ভাবস্থায় শতকরা ২ থেকে ৮ ভাগ রোগী প্রি-একলামশিয়ার সম্মুখীন হয়ে থাকেন। এতে মায়ের যেমন ক্ষতি তেমনি গর্ভের বাচ্চাও পরিপূর্ণ পুষ্টি লাভ করতে পারে না। তাই মাতৃমৃত্যু ও নবজাতকের মৃত্যুর ঝুঁকি কমাতে ও তাদের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে প্রি-একলামশিয়া প্রতিরোধ ও প্রতিকারে সবাইকে সচেতন হতে হবে। মা ও শিশুর সুস্থতার জন্য গর্ভাবস্থায় নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার পরামর্শ দিলেন এই চিকিৎসক।


সামসুন্নাহার বিনু, রির্পোটার, বিটিভি।


বিবার্তা/এরশাদ

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

ময়মনসিংহ রোড, শাহবাগ, ঢাকা-১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: bbartanews24@gmail.com ​, info@bbarta24.net

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com