ডায়াবেটিস নিরাময়যোগ্য নয়, তবে...
প্রকাশ : ০৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ১৭:২৩
ডায়াবেটিস নিরাময়যোগ্য নয়, তবে...
বিবার্তা ডেস্ক
প্রিন্ট অ-অ+

বিশ্বে বর্তমানে ৪২ কোটিরও বেশি মানুষের ডায়াবেটিস আছে আর ২০৪০ সালের মধ্যে এই সংখ্যা বেড়ে হবে ৬৪ কোটিরও বেশি। আর বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক অ্যান্ড হেলথ সার্ভে (২০১১) অনুসারে বাংলাদেশে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত মানুষের হার মোট জনগোষ্ঠীর শতকরা ১১ ভাগেরও বেশি।


ডায়াবেটিস বিশ্বব্যাপী এক বড় সমস্যা। বর্তমান বিশ্বে চিকিৎসা বিজ্ঞানের উন্নতির সাথে পাল্লা দিয়ে ডায়াবেটিস রোগীর সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে। বর্তমান বিশ্বে সবচেয়ে বেশি মৃত্যুর কারণ হয়ে দাড়িয়েছে এরকম প্রধান পাঁচটি কারণগুলোরমধ্যে ডায়াবেটিস একটি। রোগীদের সাধারণত সারা জীবন ধরে ওষুধ ও ইনসুলিন ইঞ্জেকশনের উপর নির্ভর করতে হয়৷


ডায়াবেটিসের ধরন


ডায়াবেটিস মূলত দুই ধরনের হয়। টাইপ ১ ও টাইপ ২ । টাইপ ১ ডায়াবেটিস ধরা পড়ে শৈশবেই। এক্ষেত্রে শরীরে ইনসুলিন তৈরির পরিমাণ কমে যায়। টাইপ ১ ডায়াবেটিসের সাধারণ লক্ষণগুলি হল, আক্রান্ত ব্যক্তির গলা শুকিয়ে যায় বার বার, ঘন ঘন প্রস্রাব পায়, ওজন কমে যায়আর শরীর দুর্বল লাগে।


টাইপ ২ ডায়াবেটিস সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে। এটি সাধারণত মধ্য বয়সে দেখা দেয় তবে আজকাল তরুণ বয়সেই আক্রান্ত হচ্ছেন অনেকে। এক্ষেত্রে শরীরে তৈরি ইনসুলিন ঠিকমত কাজ করতে পারে না। স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন, নিয়মিত ওষুধ সেবন আর ডাক্তারের পরামর্শ মনে চললেই এটা নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। এর কোনো নির্দিষ্ট লক্ষণ নেই বলে ধরাও পড়ে না সহজে।


এছাড়াও তৃতীয় আরেক ধরণের ডায়াবেটিস দেখা যায়, সেটা হল গর্ভাবস্থার ডায়াবেটিস। গর্ভাবস্থায় মায়ের শরীরে গ্লুকোজের পরিমাণ নিয়মিত মাপা তাই খুব জরুরী। সাধারণত সন্তান জন্মের পরে মা সুস্থ হয়ে যায়, তবে তারপরেও তার ঝুঁকি রয়ে যায় টাইপ ২ ডায়াবেটিসের।


জটিলতা


অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিসের ফলে শরীরের বিভিন্ন স্থানের রক্তনালীতে রক্ত চলাচল বাধাগ্রস্ত হয়। এর ফলে মাথা থেকে শুরু করে পা পর্যন্ত আক্রান্ত হয়। শুধু তাই নয়, হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোকের সম্ভাবনা অনেকাংশে বেড়ে যায়, চোখ নষ্ট হয়ে যেতে পারে, আর নষ্ট হয়ে যেতে পারে আপনার কিডনিও।


ডায়াবেটিসের সাথে বসবাস


ডায়াবেটিস নিরাময়যোগ্য নয়। তবে নিয়ন্ত্রিত জীবনযাত্রা এবং সঠিক ওষুধের মাধ্যমে আপনি এই রোগের লাগাম রাখতে পারবেন নিজের হাতেই। এজন্য নিয়মিত ব্যবধানে ডাক্তার দেখাতে হবে, বছরে অন্তত চারবার তো বটেই।


বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতি রোগীদের রেজিস্ট্রেশন করার সময় একটি বইও দেয়, যাতে ডায়াবেটিস নিয়ে সাধারণ তথ্যগুলো দেওয়া থাকে খুব গুছানোভাবে এবং সেই সাথে তারা একটি নোটবই দেন। কি খেতে পারবেন আর কি পারবেন না, রোজ কতোটুকু ব্যায়াম কিভাবে করা প্রয়োজন, কার কি ওষুধ কতোটুকু মাত্রায় কখন খেতে হবে সব নির্ধারণ করা থাকে রোগীর নোটবইয়ে।


বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির মতে টাইপ ২ ডায়াবেটিসে আক্রান্তদের অনেকের ক্ষেত্রেই ওষুধ খাওয়ারও দরকার পড়েনা, যদি তারা নিজেদের ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখেন, স্বাস্থ্যকর খাবার খান এবং নিয়মিত ব্যায়াম করেন।


ডায়াবেটিস প্রতিরোধ


ডায়াবেটিস প্রতিরোধ করতে এবং ডায়াবেটিসের জটিলতামুক্ত সুন্দর জীবনের অধিকারী হতে নিচের টিপসগুলো মেনে চলা প্রয়োজন :


১. আপনার প্রয়োজন অনুযায়ী পরিমিত সুষম খাবার গ্রহণ করুন।


২. অতিরিক্ত লবণ ও চর্বিজাতীয় খাবার যথাসম্ভব পরিহার করুন। প্রতিদিন কিছু পরিমাণ শাক-সবজি ও ফলমূল খান।


৩. ফাস্টফুড এবং কোল্ড ড্রিংকস পরিহার করুন। প্রতিদিন পর্যাপ্ত পরিমাণ বিশুদ্ধ পানি পান করুন।


৪. বিভিন্ন আচার অনুষ্ঠানে পরিবেশিত রিচ ফুড যথাসম্ভব পরিহার করুন।


৫. ওজন নিয়ন্ত্রণের চমৎকার একটি উপায় হচ্ছে হাঁটা। তাই কম দূরত্বের জায়গাগুলোতে হেঁটে চলাচল করুন।


৬. লিফটের বদলে সিঁড়ি ব্যবহার করুন।


৭. একটানা অধিক সময় বসে কাজ করবেন না। কাজের ফাঁকে উঠে দাঁড়ান। একটু পায়চারি করুন।


৮. অলসতা দূর করতে সংসারের টুকিটাকি কাজ নিজেই করুন। সুযোগ থাকলে বাগান করুন, খেলাধুলা করুন। সাঁতার কাটুন।


৯. সপ্তাহে তিন/চার দিন কিছু সময় ফ্রি-হ্যান্ড (যন্ত্র ছাড়া) ব্যায়াম করুন। প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ অনুযায়ী আপনার উপযুক্ত ব্যায়াম নির্বাচন করুন। কারণ সব ব্যায়াম সবার জন্য উপযুক্ত নয়। ব্যায়াম করছেন এ ধারণা মাথায় রেখে অতিরিক্ত খাদ্য গ্রহণ করবেন না।


১০. কোমরে চওড়া বেল্ট ব্যবহার করতে পারেন। এতে মেদ দ্রুত বাড়তে পারবে না।


১১. প্রচলিত বিজ্ঞাপনের চমকে আকৃষ্ট হয়ে দ্রুত চিকন হওয়ার ওষুধ বা যন্ত্র ব্যবহার করতে যাবেন না। এতে আপনার অমঙ্গলের আশঙ্কাই বেশি।


১২. প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞের পরামর্শমতো আপনার মুটিয়ে যাওয়ার মাত্রা নির্ণয় করে বয়সানুসারে সুষম খাদ্যের তালিকা তৈরি করুন।


১৩. ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হয়ে থাকলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শমতো চিকিৎসা গ্রহণ করুন। ওষুধ, ব্যায়াম, খাদ্যগ্রহণ তথা সার্বিক জীবনযাপন সংক্রান্ত তার সুনির্দিষ্ট এবং বিজ্ঞানসম্মত নির্দেশনা (যা শুধুমাত্র আপনার জন্য প্রযোজ্য) মেনে চলুন।


ডায়াবেটিসের কারণ, নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ও প্রতিরোধে করণীয় সম্পর্কে মানুষের সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। কার্যকর স্বাস্থ্যশিক্ষার মাধ্যমে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের স্বাস্থ্যকর খাদ্য গ্রহণ, নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম বা ব্যয়াম, ওজন নিয়ন্ত্রণ তথা সুশৃঙ্খল জীবনযাপনে উদ্বুদ্ধ করতে হবে।


ডায়াবেটিস স্বল্পকালীন চিকিৎসায় পুরোপুরি সেরে যাওয়ার মতো অসুখ নয়। এটিকে সারা জীবন ধরে নিয়ন্ত্রণে রাখতে হয়। ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের নানাবিধ কার্যকরী ব্যবস্থা রয়েছে। ওষুধ ছাড়া নিয়ন্ত্রিত খাদ্য গ্রহণ এবং শারীরিক পরিশ্রম বা ব্যায়ামই কখনো কখনো ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের জন্য যথেষ্ট। এর সঙ্গে কারো কারো মুখে খাওয়ার ওষুধের প্রয়োজন হয়। কারো আবার প্রয়োজন হয় ইনসুলিন ইনজেকশনের। তবে সব ক্ষেত্রেই নিয়ন্ত্রিত এবং সুশৃঙ্খল জীবনযাপন আবশ্যক।


বিবার্তা/শারমিন

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

ময়মনসিংহ রোড, শাহবাগ, ঢাকা-১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: bbartanational@gmail.com, info@bbarta24.net

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com