অর্থনীতিতে একগুচ্ছ চ্যালেঞ্জ
প্রকাশ : ০২ জানুয়ারি ২০১৯, ১৯:৪৮
অর্থনীতিতে একগুচ্ছ চ্যালেঞ্জ
মৌসুমী ইসলাম
প্রিন্ট অ-অ+

জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রেকর্ড জয় পেয়েছে আওয়ামী লীগ। কয়েকদিনের মধ্যেই গঠন হবে নতুন মন্ত্রীসভা, নতুন উদ্যোমে শুরু হবে কার্যক্রম। আগের দশ বছরে নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে বাংলাদেশ। নিয়ন্ত্রণে ছিল মূল্যস্ফীতি, সাত অংকের বৃত্তভাঙ্গে মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি। কয়েকগুন বাড়ে বাজেটের আকার, দৃশ্যমান হয়েছে পদ্মা সেতুসহ বেশ কয়েকটি মেগা প্রকল্প।


তবে, অর্জন থাকলেও কয়েক বছরে অর্থনীতিতে ছিল কিছু অপ্রাপ্তি; সংঘটিত হয় কয়েকটি আর্থিক কেলেংকারিও। ব্যাংকখাতে ঘটে লাগামহীন দুর্নীতি। মন্দ ঋণের পরিমাণ এখন এক লাখ কোটি টাকা। বিনিয়োগের জন্য আস্থায় আসেনি পুঁজিবাজার। কাঙ্ক্ষিতমাত্রায় পাওয়া যায়নি বেসরকারিখাতের বিনিয়োগ। এখন দারিদ্র্যসীমার নিচে দেশের প্রায় চার মোটি মানুষ।


সামনে যেসব চ্যালেঞ্জ


সুশাসন এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠাই সরকারের প্রধান চ্যালেঞ্জ। বন্ধ করতে হবে দখলদারি এবং দুর্নীতি। সরকার এখন এতো শক্তিশালী, এটা প্রথম থেকেই শুরু করা যায় বলে মনে করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন। তবে, অন্য অর্থনীতিবিদ বিআইডিএসের সাবেক মহাপরিচালক মুস্তফা কে মুজেরি মনে করেন, যেসব ইশতেহার প্রকাশ করে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসেছে, সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন দরকার। এক্ষেত্রে সমন্বিত পরিকল্পনা প্রয়োজন।


সুশাসন নিশ্চিত এবং দুর্নীতি দূর করা প্রথম চ্যালেঞ্জ হলেও দ্বিতীয় করণীয় হচ্ছে ব্যক্তিখাতের বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা। কারণ, সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে এখন বিনিয়োগের পরিমাণ জিডিপির ২৮ শতাংশ। অথচ সরকারের কাঙ্ক্ষিত ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধির জন্য বিনিয়োগ ৩৪ শতাংশে উন্নীত করা দরকার। মুস্তফা কে মুজেরি মনে করেন, নির্বাচনী অনিশ্চয়তার কারণে থমকে যায় বিনিয়োগ। মুখ ফিরিয়ে বসে থাকেন বিনিয়োগকারী। নতুন সরকারের অন্যতম চ্যালেঞ্জ অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা দূর করা।


বিনিয়োগকারীরা যাতে বুঝতে পারেন, অর্থনীতি স্বাভাবিক আছে। সরকারি এবং বেসরকারি খাত সবক্ষেত্রেই এটি প্রযোজ্য। তবে, ড ফরাসউদ্দিম মনে করেন, অবকাঠামোর উপর প্রচন্ড চাপ আছে। বিদ্যুৎ ক্ষেত্রে যোগান আসছে। এসব ক্ষেত্রে সরকারের প্রচেষ্টার কোনো ঘাটতি নেই। কিন্তু বেসরকারি খাতের প্রণোদনা প্রয়োজন। সংস্কার এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠা হলে, পাচার বন্ধ হলে বিনিয়োগ হবে।


উদ্বেগের নাম ব্যাংক খাত। মহাজোট সরকার দায়িত্ব নেয়ার সময় ২০০৯ সালে দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ ছিল ২২ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা। আর এখন মন্দ ঋণের পরিমাণ প্রায় এক লাখ কোটি টাকা। অর্থাৎ ১০ বছরে দেশে খেলাপি ঋণ বেড়েছে সাড়ে ৪ গুণ। আর দশ বছরে ব্যাংক খাতে দুর্নীতির মাধ্যমে লোপাট হয়েছে ২২ হাজার কোটি টাকার বেশি।


ড. ফরাসউদ্দিন মনে করেন, ব্যাংক খাতে প্রতিযোগিতা সৃষ্টি করা প্রয়োজন। মালিকদের ক্ষমতা খর্ব করতে হবে। বাজার অর্থনীতিতে এটা চলতে পারে না। সুশাসন নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংককে তার শক্তিমত্তা প্রয়োগ করতে হবে। যদি উপযুক্ত নীতি, কৌশল, বিনিময় হার সঠিক থাকে তাহলে অর্থ পাচার কমবে। তিনি বলেন, বাংলাদেশে যদি ৮৩ টাকায় এক মার্কিন ডলার কেনা যায়, আর এটা যদি পাকিস্তানে ১৪২ টাকায় বিক্রি করা যায়- তাহলে অর্থ চলে যাবে। কারণ, অর্থনৈতিক স্বার্থ যেখানে জড়িত সেখানে দেশপ্রেম জোরদার হয় না।


ব্যাংকখাত নিয়ে মোস্তফা কে মুজেরির মতও এমনই। তিনি বলেন, ব্যাংক খাতে সুশাসন ফেরাতে কাঠামোগত পরিবর্তন দরকার। মন্দঋণের উত্থানে ব্যাংকখাতের স্বাস্থ্য খারাপ হচ্ছে। ব্যাংকগুলোর কর্মকাণ্ড সঠিকভাবে না করা গেলে, অর্থনীতির চাকা ঘুরবে না। তার মতে ব্যাংকখাতের সমস্যা দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে, কিন্তু দূর করার জন্য সমন্বিত প্রচেষ্টা নেই।


সাধারণ মানুষের কাছে আস্থায় আসেনি পুঁজিবাজার। দশ বছরে পুঁজিবাজারে দুটি বড় ধসে পুঁজি হারায় হাজার হাজার বিনিয়োগকারী। কমিশন গঠন হলেও দোষীদের শাস্তি হয়নি। বাজারে এখনও তেমন ভালো কোম্পানি আসেনি। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সংখ্যাও হাতে গোনা। শক্তিশালী পুঁজিবাজার গড়ে তোলাও সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ।


ড. ফরাসউদ্দিন মনে করেন, পুঁজিবাজার ব্যবস্থাপনায় সুশাসন প্রয়োজন। স্বাধীন পরিচালকদের ঠিক মতো যদি নির্বাচন করা হয়। যদি অর্থ নির্বাহী এবং মূখ্য অর্থ নির্বাহী এই দুই জনকে ভালো মতো কাজ করতে দেয়া হয় তাহলে ওইখানে সুশাসন আসবে।


তিনি মনে করেন, মূলধন বাজারের কাজ হলো বিনিয়োগ যোগ্য বাজার তৈরী করা। কিন্তু নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি একটি আইন করে রেখেছে, যা বিনিয়োগের অন্তরায়। দুই শতাংশ ইক্যুইটি না থাকলে পরিচালক হওয়া যাবে না। এটি হলো সবচেয়ে বেশি এন্টি ইনভেস্টমেন্ট। ব্যাংক, বীমা এবং পুঁজিবাজারে প্রতিযোগিতা সৃষ্টি করলে মানুষের অর্থ জমা রাখবে।


চলতি অর্থ অর্থবছরে এনবিআরের মাধ্যমে সরকারের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল দুই লাখ ৪৮ হাজার ১৯০ কোটি টাকা। আগের বছরের চেয়ে যা ৩০ শতাংশ বেশি। জুলাই থেকে নভেম্বর পর্যন্ত চলতি অর্থবছরের প্রথম ৫ মাসে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ঘাটতি আট হাজার ৭৫৮ কোটি টাকা।


দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশেই ট্যাক্স জিডিপি রেশিও কম। এক্ষেত্রে ড. ফরাস উদ্দিন বলেন, সঠিকভাবে পরিকল্পনা করলে কাউকে তেমন কষ্ট না দিয়েও, অনেক বেশি রাজস্ব আয় সম্ভব। সেক্ষেত্রে সঠিক পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে। আর্থিকখাতে ব্যাংক-বীমা-পুঁজিবাজার পরিচালনায় একটি সংস্কার করতে হবে।


নিজেদের অর্থে সম্পন্ন হচ্ছে স্বপ্নের পদ্মা সেতু। গেল নভেম্বর পর্যন্ত পদ্মা সেতু কাজের অগ্রগতি ৫৯ শতাংশ। ব্যয় হবে ৩০ হাজার ১৯৩ কোটি টাকা। চলমান আছে মেট্টোরেলের কাজ। এই প্রকল্পের অগ্রগতি হয়েছে ২৪ শতাংশ। তবে, মেগা প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন সব ক্ষেত্রে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে পিছিয়ে রয়েছে বলে মনে করেন মোস্তফা কে মুজেরি। তার মতে, বাস্তবায়ন যদি সঠিকভাবে না হয়, তাহলে সুযোগ সুবিধা পেতেও দেরি হবে। একই সঙ্গে বাড়বে ব্যয়। তাই তদারকি করে দ্রুত সময়ে প্রকল্পগুলো শেষ করাও সরকারের সামনে চ্যালেঞ্জ।


এই অর্থনীতিবিদ মনে করেন, কর্মসংস্থান বাড়াতে হবে। জনসংখ্যা বাড়ছে, তবে সেই সঙ্গে কর্মসংস্থান বাড়ছে না। এক সময় কাজের মূলক্ষেত্র ছিল কৃষি। কিন্তু এখন সেই জায়গা দখল করেছে সেবাখাত এবং শিল্প। এক্ষেত্রে মানবসম্পদের প্রশিক্ষণ দেয়া খুবই জরুরী। প্রযুক্তি নির্ভর কর্মসংস্থানের বাজার বাড়ছে। সেই বাজার ধরতে হলে প্রশিক্ষিত জনবল সৃষ্টি করতে হবে। এক্ষেত্রে মহাপরিকল্পনা দরকার। গ্রামীণ এবং শহরে জনগোষ্ঠীকে উপযুক্ত করে কাজে সম্পৃক্ত করতে হবে।


ড. ফরাসউদ্দিন মনে করেন, দারিদ্র্য নিমূর্লে বেশ এগিয়েছে বাংলাদেশ। তিনি বলেন, কোনো দেশেই এতো বেশি হারে দারিদ্র্য কমেনি। দশ বছর আগে ৪০ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্য সীমার নিচে বাস করলেও এখন সেই হার মাত্র ২২ শতাংশ। তবে, এখনও তিন কোটি ৭০ লাখ মানুষ দারিদ্র্য সীমার নিচে বাস করছে। এক্ষেত্রে কার্যকর পরিকল্পনা হাতে নেয়াও সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জ। এই অর্থনীতিবিদ মনে করেন, দুর্বল অবস্থায় চলছে ভূমি ব্যবস্থাপনা। এজন্য ঢাকায় একটা ‘মেট্রোপলিটন সরকার’ দরকার। অনেকগুলো মন্ত্রণালয়কে ঢাকার বাইরে নেয়ার বিষয়েও মত দেন তিনি।


বিবার্তা/মৌসুমী/কাফী

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

ময়মনসিংহ রোড, শাহবাগ, ঢাকা-১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: bbartanational@gmail.com, info@bbarta24.net

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com