সউদি আরবে সিনেমার জন্ম, মৃত্যু ও পুনর্জন্ম
প্রকাশ : ১২ ডিসেম্বর ২০১৭, ১৮:২৬
সউদি আরবে সিনেমার জন্ম, মৃত্যু ও পুনর্জন্ম
বিবার্তা ডেস্ক
প্রিন্ট অ-অ+

সউদি আরবে সিনেমা দেখা ও দেখানো নিষিদ্ধ - এটাই মানুষ জেনে এসেছিল এতোকাল। ক'দিন আগে নিষেধাজ্ঞার সেই দেয়াল ভেঙ্গে গুঁড়িয়ে দিলেন দেশটির ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান। নামে ক্রাউন প্রিন্স হলেও সউদি আরবের প্রকৃত শাসক তিনিই। তাঁরই অঙ্গুলি হেলনে সেদেশে রাত হচ্ছে দিন আর দিন হয়ে যাচ্ছে রাত। যেমন এখন বৈধ হলো সিনেমা প্রদর্শন। খবর পাওয়া গেছে, আগামী কয়েক বছরের মধ্যে সউদি আরবে ৩০০ সিনেমা হল বানানো হবে।


কাজটা ভালো কি মন্দ - সে আরেক বিষয়। তবে যেহেতু ক্রাউন প্রিন্সের ইচ্ছা এখানে কাজ করেছে, অতএব সউদি মিডিয়া মুক্তকচ্ছ হয়ে নেমেছে সিদ্ধান্তটিকে সমর্থন দিতে। মঙ্গলবার দেশটির একটি পত্রিকা নতুন সিদ্ধান্তের সমর্থনে এক নিবন্ধে এ কথাই বলেছে। নিবন্ধটি অনুবাদ করেছেনহুমায়ুন সাদেক চৌধুরী


সউদি আরবের বড় বড় নগরগুলোতে বছর ৫০ আগেও সিনেমা ছিল। ক্যালিফোর্নিয়া অয়েল কম্পানিতে (পরে আরামকো) কর্মরত পশ্চিমারা সউদি আরবে সিনেমা চালু করে। ১৯৩০ সালের দিকে তারা নিজেদের বসতবাড়ির আঙ্গিনায় প্রথম বড় পর্দা বাসায়। এতে তারা আমেরিকা ও ইউরোপের সিনেমা দেখতো।


বিদেশিদের আবাসিক কমপ্লেক্স থেকে কালক্রমে সিনেমা ছড়িয়ে পড়ে সউদি আরবের রিয়াদ,জেদ্দা, তায়েফ, আবহা - এ চারটি বড় নগরে। জেদ্দায় থিয়েটারের (সিনেমা হল) সংখ্যা পৌঁছে যায় ৩০টিতে। টিকেটের দাম ছিল তিন থেকে ১০ রিয়াল।


ওই সময় মুভি থিয়েটারগুলো প্রধানত থাকতো কোনো-না-কোনো স্পোর্টস ক্লাব, বিদেশি দূতাবাস কিংবা বিশিষ্ট ব্যক্তির বাসভবনে। ধনাঢ্য অনেক ব্যবসায়ী এরকম অনেক থিয়েটার গড়েছিলেন। তবে তার একটাও কায়রো বা বৈরুতের মতো অন্যান্য আরব নগরে অবস্থিত থিয়েটার হলের মানের ধারেকাছে ছিল না।


সেসময় এরকম সিনেমা হল চালু করা খুব সহজ ছিল। কারণ, তখন এ জন্য কোনো অনুমতির প্রয়োজন হতো না। রিয়াদের আল-মুরাব্বা এলাকায় এ সময় গড়ে ওঠে অনেকগুলো সিনেমা হল। এক পর্যায়ে রিয়াদবাসীর মুখে মুখে ওই এলাকার নামই হয়ে যায় ''সিনেমা পল্লী''। জেদ্দায় সবচাইতে নামকরা সিনেমা হলগুলোর একটি ছিল ''বাব শরিফ''। এটি ছিল জেদ্দার পুরনো অংশে। এছাড়া হিন্দাভি এলাকায় ছিল আরেকটি হল ''আবু সায়েফা''।


সউদি আরবে সিনেমা নির্মাণের কথা বলতে গেলে বলতে হয়, ১৯৬০ ও ১৯৭০ দশকের মধ্যবর্তী সময়ে ইস্টার্ন প্রভিন্সে কর্মরত তেল কম্পানিগুলোর উদ্যোগে অল্প ক'টি তথ্যচিত্র নির্মিত হয়। এগুলোর মধ্যে যে ক'টি বিখ্যাত হয় তার একটি আরামকো'র তৈরি। এটি ছিল সউদি আরবের তৎকালীন বাদশা আবদুল আজিজ কর্তৃক দেশের প্রথম তেলকুপ উদ্বোধনের ওপর নির্মিত।


সউদি আরবের প্রথম চলচ্চিত্র পরিচালক মনে করা হয় আবদুল্লাহ আল-মুহাইসেনকে। ১৯৭৫ সালে তাঁর প্রথম ছায়াছবি মুক্তি পায়। এটি ছিল রিয়াদ নগরীর উন্নয়নের ওপর নির্মিত একটি প্রামাণ্যচিত্র। ১৯৭৬ সালে আল-মুহাইসেন কায়রোর প্রামাণ্য চলচ্চিত্র উৎসবে অংশ নেন। ১৯৭৭ সালে তিনি নির্মাণ করেন আরো গুরুত্বপূর্ণ একটি ছবি। সেটিও প্রামাণ্যচিত্রই, তবে তাতে বিধৃত হয়েছে লেবাননের গৃহযুদ্ধ এবং এ যুদ্ধে অনিন্দ্যসুন্দর নগরী বৈরুতের ধ্বংসস্তুপে পরিণত হওয়ার কাহিনী ও ছবি। সেরা শর্টফিল্ম হিসেবে এটি নেফারতিতি পুরস্কারে ভূষিত হয়।


জুহাইমান আল-ওতাইবি ও তার সঙ্গী চরমপন্থীরা পবিত্র ক্বাবা দখলের অপচেষ্টা চালিয়ে ব্যর্থ হওয়ার পর সউদি আরবের ধর্মীয় ও সামাজিক অঙ্গনে পরিবর্তনের যে ঢেউ জাগে, তার অন্যতম শিকার হয় সউদি সিনেমা। সারা দেশে সিনেমা নিষিদ্ধ করা হয়। বিদেশি দূতাবাসগুলো তাদের থিয়েটারের দরজা সউদিদের জন্য বন্ধ করে দেয়। সেসময় এমনকি অনেক ধর্মীয় অনুষ্ঠানের চিত্র ধারণকেও ''অপরাধ'' বলে মনে করা হতে থাকে।


এরই ধারাবাহিকতায় গত কয়েক দশক ধরে সউদিবাসী বিশ্বাসই করতো না যে সিনেমা হতে পারে সংস্কৃতি ও জ্ঞানের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস। অনেক সউদির মাঝে সেই মনোবৃত্তি এখনো বিদ্যমান। বিশেষ করে সিনেমার ক্ষেত্রে এটা বেশি। কেননা, সিনেমায় এমন অনেক কিছু দেখানো হয়, যা ইসলামের মূল্যবোধ ও শিক্ষার বিপরীত।


তবে দেশে মুভি থিয়েটার না-থাকলেও লোকজন কিন্তু বসে থাকেনি। তারা নিজেদের বাড়িতেই ছোট ছোট থিয়েটার বানিয়ে সিনেমা দেখেছে। অনেকে নতুন কোনো মুক্তি পাওয়ার খবর পেলেই ছুটে গেছে প্রতিবেশী দেশ বাহরাইন কিংবা ইউএই-তে। সেখানে হলে বসে দেখে নিয়েছে কাঙ্ক্ষিত ছবিটি।


আজ বেশিরভাগ সউদি, বিশেষ করে নতুন প্রজন্ম, সিনেমার গুরুত্ব বুঝতে শিখেছে। চলচ্চিত্রশিল্পের প্রতি সউদি তরুণদের আগ্রহটা বোঝা যায় তাদের সৃজনশীল প্রডাকশন হাউসগুলো দেখে। কয়েক বছর আগে তেলফাজ১১ ও ইউটার্ন প্রভৃতি সোশ্যাল মিডিয়ার আত্মপ্রকাশের পর এসব প্রডাকশন হাউসের যাত্রা শুরু হয়। এই তরুণের দল তাদের মেধা বৃদ্ধির চর্চা করতে কাজে লাগায় ইউটিউবকে।


বিবার্তা/হুমায়ুন/কাফী

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: bbartanational@gmail.com, info@bbarta24.net

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com