বিহারিদের জন্য হাজার কোটি টাকার প্রকল্প!
প্রকাশ : ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৭, ১৮:৫২
বিহারিদের জন্য হাজার কোটি টাকার প্রকল্প!
প্রিন্ট অ-অ+

ঢাকা থেকে প্রকাশিত একটি দৈনিক সোমবার খবর ছাপিয়েছে, রাজধানীর মোহাম্মদপুরে বসবাসরত বিহারিদের জন্য বাংলাদেশ সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে ছয় হাজার ৩২টি ফ্ল্যাট নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।  এসব ফ্ল্যাটের প্রতিটির আয়তন হবে ৮০০ বর্গফুট। এই প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যয় ধরা হয়েছে দুই হাজার ৩৯০ কোটি ২৪ লাখ টাকা। মোহাম্মদপুর বসিলায় ৬৮ একর জমির ওপর ফ্ল্যাটগুলো নির্মিত হবে। প্রকল্পে ১৪ তলাবিশিষ্ট ৫৮টি আবাসিক ভবন নির্মিত হবে। প্রতিটা ভবনে ১০৪টি ফ্ল্যাট ব্যবস্থা থাকবে। প্রতিটি ফ্ল্যাটে থাকবে একটি করে বাথরুম, কিচেন এবং দু’টি করে বেডরুম ও বারান্দা। প্রতিটি ভবনে লিফটের ব্যবস্থা থাকবে। ফায়ার ফাইটিং ব্যবস্থা এবং বিদ্যুতের জন্য পৃথক জেনারেটর ও সাব-স্টেশন থাকবে। প্রকল্পে বাণিজ্যিক ভবন, কমিউনিটি সেন্টার, স্কুল, মসজিদ, খেলার মাঠ, প্রাতভ্রমণের জন্য পার্ক নির্মাণ করা হবে। থাকবে রাস্তা, বিদ্যুৎ, ড্রেন ও পানি সরবরাহ লাইন। দু’টি খেলার মাঠ ও পার্ক থাকবে। এর পাশাপাশি বাণিজ্যিক ভবন ও কমিউনিটি সেন্টার, ২৮টি কালভার্ট থাকবে। আরো থাকবে প্রধান গেট, গার্ড রুম, অভ্যর্থনা কক্ষ, একটি সেতু ও ৫৮টি জেনারেটর।


বিশাল আয়োজন, এতে আর সন্দেহ কী। আপাতদৃষ্টিতে ভালো একটি উদ্যোগ এবং এর বিরোধিতা করারও কিছু নেই। কিন্তু তারপরও মনে অনেক প্রশ্ন ও জিজ্ঞাসা এসে ভিড় জমায়। একটু বেশি বয়স যাঁদের, তাদের মনে সন্দেহাতীতভাবে ভিড় করবে অনেক স্মৃতিও।


প্রশ্ন দিয়েই শুরু করি। প্রশ্ন হলো, কারা এই বিহারী? ইতিহাস সাক্ষী, ১৯৪৭ সালে ধর্মের ভিত্তিতে উপমহাদেশ ভাগ হয়ে ভারত ও পাকিস্তান নামে দু'টি রাষ্ট্রের অভ্যুদয় ঘটে। সেসময় বাংলাদেশ থেকে যেমন দলে দলে হিন্দুরা ভারতে পাড়ি জমায়, তেমনি ভারত থেকেও বিপুলসংখ্যক বাঙালি ও অবাঙালি মুসলমান এদেশে এসে আশ্রয় নেয়। ওপার থেকে আসা বাঙালি মুসলিম শরণার্থীরা এদেশের মূল জনস্রোতে দ্রুত মিশে যাওয়ায় তাদের আলাদা করে শরণার্থীরূপে চিহ্নিত করা সম্ভব হয় না, তার প্রয়োজনও পড়ে না।


কিন্তু অবাঙালি মুসলিম শরণার্থীদের বেলায় এ বাস্তবতা কাজ করে না, বরং তা হয় উল্টো। তাদের একটি বিরাট অংশ, যারা এসেছিল ভারতের বিহার রাজ্য থেকে, তারা তাদের আশ্রয়দাতা বাঙালি ভাইদের সঙ্গে মিশে যাওয়া তো দূরের কথা, সাধারণ সৌজন্যমূলক মেলামেশায়ও অনীহা দেখাতে থাকে। অবিশ্বাস্য মনে হলেও সত্য, তাদের এই আচরণ কিন্তু আশ্রিতজনের স্বাভাবিক কুণ্ঠা নয়, বরং নিজেদের ''অভিজাত'' এবং আশ্রয়দাতা বাঙ্গালিদেরকে ''ছোট জাত'' ভাবার অবিশ্বাস্য হীন মনোবৃত্তিসঞ্জাত। এই ঘৃণ্য মনোভাব পোষণ করেই তারা ক্ষান্ত হয়নি, পাকিস্তান আমলের পুরো সময়টা তারা সদম্ভে এর প্রকাশও ঘটিয়েছে। প্রবীণরা নিশ্চয়ই সাক্ষ্য দেবেন, বাঙালি-বিহারি দাঙ্গা তো ছিলই, এমনকি কর্মস্থলে, পথেঘাটে সর্বত্রই এই আশ্রিত জনগোষ্ঠীর অকারণ টিটকারি ও হামলার শিকার হতে হয়েছে এদেশের মানুষকে। স্কুলে তাদের শিশু-কিশোররাও একই আচরণ করতো। এসব কোনো কল্পকথা নয়, বাস্তব সত্য।


এই বিহারিরা তাদের বাঙালিবিদ্বেষের চূড়ান্ত প্রকাশটি ঘটায় ১৯৭১ সালে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সময়। তারা সেদিন ঝাঁক বেঁধে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর সঙ্গে মাঠে নামে, ওদের সঙ্গে অংশ নেয় খুন ধর্ষণ অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটে। এসব তো ইতিহাস।


তার চাইতেও বড় ইতিহাস হলো, পাকি হানাদার ও তাদের দোসরদের পরাভূত করে ১৯৭১ সালেই বাংলাদেশ স্বাধীন হয়। কিন্তু পরাজিত বিহারিরা বাংলাদেশকে স্বীকার করতে রাজি হয় না। তারা নিজেদের বলে ''আটকে পড়া পাকিস্তানী''। বললে হবে কী, ধড়িবাজ পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠীও ততোদিনে মীরজাফরদের ব্যাপারে মনস্থির করে ফেলেছে। নানা টালবাহানায় তারা এই বিহারীদের ফিরিয়ে নেয়া ঠেকাতে ঠেকাতে প্রায় ৫০ বছর পারই করে ফেলেছে।


এ-ই যখন অবস্থা, তখন আমরা হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে তাদের জন্য হাজার ফ্ল্যাট বানানোর উদ্যোগ নিতে যাচ্ছি। আবারও বলি, মানবিক দিক থেকে দেখলে এর বিরোধিতা করার যুক্তি নেই। আমরা তা করছিও না। তবে কয়েকটি প্রশ্ন রেখে যেতে চাই :


০১. বিহারিরা কি পাকিস্তানের প্রতি তাদের আনুগত্য আনুষ্ঠানিকভাবে ত্যাগ করেছে? তারা কি এদেশকে নিজেদের দেশ বলে স্বীকার করে?


০২. পাকিস্তানের সঙ্গে কি এদের (একসময় যাদের  আমরা বলতাম ''ঘাতক কাঁটা'') ব্যাপারে চূড়ান্ত কোনো ফয়সালা হয়েছে?


০৩. নানা সুযোগ-সুবিধা পেয়ে এর আবার বর্তমান পাকিস্তানের মতো এখানেও নিজেদের হিংস্র চেহারা নিয়ে আবির্ভূত হবে না তো? (সবাই জানেন, তারপরও বলি, আশ্রয় পেয়ে এরা পাকিস্তানের করাচিকে জীবন্ত দোজখ বানিয়ে ফেলেছে)।


০৪. বিহারিদের জন্য এতো বড় প্রকল্প কি সরকারের উচ্চ পর্যায়ের জ্ঞাতসারে ও সিদ্ধান্তে নেয়া হচ্ছে, নাকি এর পেছনে কারো অতি-উৎসাহ কাজ করছে?

সরকার কি আমাদের সামান্য পর্যবেক্ষণগুলো একটুখানি হলেও ভেবে দেখবেন?

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (২য় তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: bbartanational@gmail.com, info@bbarta24.net

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com