ছোট দেশ, বড় কাজ
প্রকাশ : ১৪ সেপ্টেম্বর ২০১৭, ১৭:২৪
ছোট দেশ, বড় কাজ
প্রিন্ট অ-অ+

মানুষের ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবন কতোই বৈপরীত্যের মধ্য দিয়েই না এগিয়ে চলে! এ বুঝি অদৃশ্যে প্রকৃতিরই বেঁধে দেয়া নিয়ম। নইলে পৃথিবী নামের ছোট এই গ্রহটিতে এতো বৈপরীত্যের খেলা প্রতিনিয়ত দেখি কিভাবে? পৃথিবীর, এমনকি বড় কোনো দেশেরও একাংশে যখন এক ফোঁটা পানির অভাবে শুকিয়ে মরছে মানুষ, প্রাণী, উদ্ভিদ ও তৃণলতা, ঠিক অপর তখন হয়তো বন্যায় ভাসছে মানুষ ও তার ঘরবাড়ি, জমির ফসল, গৃহপালিত প্রাণী ও পাখি।


আমাদের রাষ্ট্রিক জীবনও বুঝি এর চাইতে আলাদা কিছু নয়। আমাদের প্রতিবেশী মিয়ানমার নামের দেশটি যখন তার রোসাং রাজ্যের (এখন রাখাইন) আদিবাসী রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে শুধু তাদের ধর্মবিশ্বাসের কারণে নিজ দেশের নাগরিক বলে স্রেফ অস্বীকার করছে, খুন-জখম-ধর্ষণ-নিপীড়ন এবং সর্বশেষে বিতাড়িত করছে, তখন ঈষৎ দূরের প্রতিবেশী সিঙ্গাপুর তাদের রাষ্ট্রপ্রধানের পদটি এবার নির্দিষ্ট করে দিয়েছে জাতিগত মালয়ীদের জন্য, যারা ধর্মে রোহিঙ্গাদের মতোই মুসলিম।



সিঙ্গাপুর এবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত করেছে হালিমাহ বিনতি ইয়াকুবকে, যিনি দেশটির প্রথম নারী প্রেসিডেন্ট। ধর্মবিশ্বাসে মুসলিম এই নারী অল্পদিন আগেও সেদেশের স্পীকার ছিলেন। সিঙ্গাপুর নামের নগররাষ্ট্রটি এবার জেনেশুনেই একজন মুসলিমকে দেশের প্রেসিডেন্ট বানানোর পদক্ষেপটি নিয়েছে। তারা বলেছে, সিঙ্গাপুর হচ্ছে বহু সংস্কৃতির দেশ। এদেশের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় সবার অংশীদারিত্ব আছে - এই বোধ দেশের ক্ষুদ্র-বৃহৎ সব জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে আরো ভালোভাবে ছড়িয়ে দিতে হবে। তাই এবার দেশের প্রেসিডেন্ট পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সুযোগ থাকবে শুধু সংখ্যালঘু মালয়ী জাতিগোষ্ঠীর মানুষদের।


সিঙ্গাপুরে প্রেসিডেন্ট পদটি, বাংলাদেশসহ অন্য অনেক দেশের মতোই প্রধানত আনুষ্ঠানিক। নিয়মতান্ত্রিক রাষ্ট্রপ্রধান তিনি ; প্রধানমন্ত্রীই সরকারপ্রধান। সুতরাং দেশশাসনে নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট হালিমাহ ইয়াকুবের খুব বেশি-কিছু ভূমিকা থাকবে না - এটাই স্বাভাবিক।


তবে নিয়মতান্ত্রিক রাষ্ট্রপ্রধানের ভূমিকাও আমাদের আলোচ্য বিষয় নয়। আমাদের আলোচ্য হলো সিঙ্গাপুরের ক্ষমতাসীন দলের দূরদর্শিতা ও উদার সমন্বয়বাদী মনোভাব।


সিঙ্গাপুর ছোট দেশ বলে অনেকে হয়তো তেমন গা করবেন না। বিশ্বমিডিয়াও এ নিয়ে থাকবে নীরব। কিন্তু আমরা বিস্ময়ে অভিভূত হই, যখন ভাবি কতোটা দূরদর্শী হলে এরকম জাতীয় ঐক্য ও সমন্বয়মূলক পদক্ষেপ নেয়া যায়! সব জাতিগোষ্ঠীর মানুষ যেন নিজেদের রাষ্ট্রক্ষমতার অংশভাগী ভাবতে পারে, সেজন্য ডিক্রি জারি করে দেশের শীর্ষপদটি শুধু সংখ্যালঘু একটি জাতিগোষ্ঠীর জন্য, একবারের জন্য হলেও, সংরক্ষিত রাখার মধ্যে শুধু সহিষ্ণুতা ও উদারতাই নয়, প্রগাঢ় দেশপ্রেম এবং রাষ্ট্রনায়কোচিত প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতারও স্বাক্ষর রয়েছে। সিঙ্গাপুরের এই দৃষ্টান্ত থেকে আজকের সংঘাতক্ষুব্ধ, ক্ষমতাপাগল ও অসহিষ্ণু বিশ্বের শিক্ষা নেয়ার অনেক কিছুই আছে।


মিয়ানমার যখন শুধু মুসলিম হওয়ার ''অপরাধে'' রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে মধ্যযুগীয় বর্বরতায় কচুকাটা ও বিতাড়িত করছে, সিঙ্গাপুর তখন কেবল মালয়ী হওয়ার কারণেই এবার দেশের শীর্ষ পদটি তুলে দিল একজন নারীর হাতে। ওয়েল ডান সিঙ্গাপুর, হ্যাটস অফ টু ইউ!


এর মধ্য দিয়ে সিঙ্গাপুর নামের ছোট দেশটি একটি বড় ইতিহাস গড়লো। এ থেকে বিশ্বসম্প্রদায়ের অনেক কিছু ভাবার, বোঝার ও করার আছে বলেই আমরা মনে করি।

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (২য় তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: bbartanational@gmail.com, info@bbarta24.net

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com