ন্যাড়া পাহাড়ের মরণকামড়
প্রকাশ : ১৯ জুন ২০১৭, ১৯:৫৬
ন্যাড়া পাহাড়ের মরণকামড়
প্রিন্ট অ-অ+

কথা ছিল, তীব্র দাবদাহে বিপর্যস্ত এই বাংলায় স্বস্তি আনবে আষাঢ় মাসের বৃষ্টি। বৃষ্টি এলো, কিন্তু সঙ্গে নিয়ে এলো দুঃসংবাদ।


প্রবল বৃষ্টিতে পানির নিচে তলিয়ে যাওয়া চট্টগ্রামের জন্য নতুন কোনো খবর নয়, অপরিচিত নয় পাহাড় ধসে কিছু মানুষের মৃত্যুও। সবই হলো, কিন্তু হলো অভূতপূর্ব মাত্রায়। প্রধানত রাঙ্গামাটিতে এবং পাশাপাশি চট্টগ্রাম,বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলায় পাহাড় ধসে প্রাণহানির সংখ্যা ইতিমধ্যে দেড় শ' ছাড়িয়ে গেছে। রাঙ্গামাটির সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ এখনো চালু হয়নি। যোগাযোগবিচ্ছিন্ন অনেক মানুষ দুর্গম এলাকায় অনাহারে-অর্ধাহারে দিন যাপন করছে বলে মিডিয়ায় প্রতিদিনই খবর আসছে।


জানি, একদিন সব ঠিক হয়ে যাবে। নতুন নতুন আরো নানা ঘটনা-দুর্ঘটনার চাপে পড়ে আমরা ভুলে যাব দেড় শতাধিক স্বজন হারানোর বেদনা। কিন্তু প্রকাশ্যে-গোপনে একটি প্রশ্ন থেকেই যাবে - এই বিপুল প্রাণহানির দায় কার?


মোটা দাগে এ জন্য সরকারকেই ''এক নং আসামী'' করা যায়। বলা যায়, সরকারের এতো এতো সংস্থা, প্রশাসনে এতো কর্মকর্তা, এতো লোকবল - কোথায় ছিল তারা, তাদের চোখের সামনে এতো বড় বিপর্যয় কীভাবে ঘটতে পারলো?


এসব প্রশ্ন ইতিমধ্যেই উঠতে শুরু করেছে, সংশ্লিষ্টরা নিজেদের মতো করে জবাবও দিয়ে যাচ্ছেন। মিডিয়ায় তা যথারীতি প্রকাশিত/প্রচারিতও হচ্ছে। কাজেই এ নিয়ে আলোচনা বাহুল্যমাত্র। অতএব ওদিকে পদক্ষেপ নাস্তি। আমরা বরং আত্মসমালোচনাই করতে চাই।


আমরা বলতে চাই, পাহাড়ীরা কয়েক শ' বছর আগে এদেশে আসার পর থেকে পাহাড়েই বসত করে আসছে। পাহাড়ই তাদের বসতভিটা, পাহাড়ই তাদের জীবনধারণের মাধ্যম। এই দীর্ঘ বসতকালে প্রতি বছরই বর্ষা এসেছে, এমন দেশকাঁপানো ধসের কথা তো আগে কেউ কখনো শোনেনি!


কিন্তু কয়েক বছর ধরে অল্প-অল্প এবং এবার একেবারে দেশদুনিয়া কাঁপিয়ে পাহাড় ধস হলো। যেন পাহাড় আমাদের জানিয়ে দিলো যে অনেক সহ্য করেছি, আর নয়।


পাহাড়ে বাস করা আর পাহাড় কেটে বাড়ি বানানো এবং নির্বিচারে বন উজাড় করা কোনোভাবেই এককথা নয়। কিন্তু মানুষ তা বোঝেনি। তারা প্রকৃতি সংরক্ষণ করে তার ফল ভোগ করার চাইতে তাকে ভোগ করতে-করতে উজাড় করাকেই মঙ্গলজনক ভেবেছে। এই ভাবনা যে ভুল ও আত্মঘাতী, সে কথা মনে করিয়ে দেয়া যাদের দায়িত্ব ছিল, এই অপকর্ম ঠেকানোর জন্য সরকার যাদের পেছনে বছর-বছর বিপুল অর্থ ব্যয় করে, তারা সকলেই কুম্ভকর্ণের নিদ্রায় মগ্ন থাকাকেই বিধেয় মনে করেছেন।


অতএব যা হবার তা-ই হয়েছে। প্রকৃতি তার আপন নিয়মে প্রতিশোধ নিয়েছে। পাহাড় ন্যাড়া করে ঢালে তৈরি করা হয়েছিল ঘর, সেখানে মাটিচাপায় মারা গেছে মানুষ। যেসব বাড়ি ছিল পাহাড়ের পাদদেশে; সবগুলোতে এখন পাহাড় ভেঙে মাটি ঢুকেছে। ভূমিধস যেসব এলাকায় ঘটেছে, তার প্রায় প্রতিটি স্থানেই পাহাড় কাটা এবং গাছ উজাড়ের চিহ্ন হিসেবে ন্যাড়া পাহাড় দেখা গেছে। ন্যাড়া পাহাড় এবার মরণকামড় দিয়েছে।


বর্ষা সবে এসেছে। জানি না সামনে আরো কতো দুর্যোগ-দুর্বিপাক আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে। সম্ভাব্য এসব দুর্যোগ-দুর্বিপাক থেকে রক্ষা পেতে আমাদের সকলের এখনই সচেতন ও সক্রিয় হওয়া প্রয়োজন। নইলে ন্যাড়া পাহাড়ের মরণকামড় বার বার আমাদের ক্ষতবিক্ষত করেই চলবে।

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: bbartanational@gmail.com, info@bbarta24.net

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com