হাল হালাক আর হাসনাহেনা
প্রকাশ : ২৮ আগস্ট ২০১৭, ০৯:০৫
হাল হালাক আর হাসনাহেনা
জিয়াউদ্দিন সাইমুম
প্রিন্ট অ-অ+

হালহাকিকত মানে বর্তমান অবস্থা। বোঝা যাচ্ছে হাল মানে বর্তমান। কিন্তু বাংলায় হালই হয়ে দাঁড়ালো অবস্থা। যেমন করে ফারসি ‘হররোজ’ মানে প্রতিদিন। কিন্তু বাংলা ‘রোজ’ হয়ে গেল প্রতিদিন।


আরবি ‘হাল’ থেকে বাংলায় এ হাল শব্দটি এসেছে। হাল মানে দশা অবস্থা (বিবি সাহেব তোমার এ হাল কে করিল- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর; আল্লাহ যে হালে রাখেন সে হালেই থাকি- সরদার জয়েনউদ্দীন)।


রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বর্তমান কাল অর্থেও শব্দটি ব্যবহার করেছেন (সাহিত্যের এই রকম হাতে ঠেলাঠেলি আরম্ভ হয়েছে হালে)।


সংস্কৃত হল্ ধাতু থেকেও বাংলায় ‘হাল’ শব্দটি এসেছে। এ হাল শব্দের গঠন হচ্ছে হল্ + অ। এটার অর্থ লাঙ্গল, গরুগাড়ির চাকার লৌহবেড়। এ হাল থেকেই নৌকা চালানো বা ঘোরানোর কাঠের যন্ত্রবিশেষ অর্থে হাল শব্দটি এসেছে।


আবার আরবি হালাক থেকে বাংলায় হালাক শব্দটি এসেছে। আরবিতে হালাক মানে সর্বনাশ, ধ্বংস। বাংলায় বিশেষ্য হিসেবে শব্দটি আরবি অর্থেই ব্যবহৃত হয়। (আবার হত্যা বা বধ অর্থের ব্যবহৃত হয় হাল না করিয়া করে এক হালাক- ভারতচন্দ্র রায় গুণাকর)। ‘হাল্লাক’ বানানভেদ। কিন্তু বিশেষণে শব্দটি পরিশ্রান্ত বা হয়রান (অনর্থক হাল্লাক হয়ে ফিরে যাবে- কাজী নজরুল ইসলাম) ও প্রশান্ত অর্থে ব্যবহৃত হয় (মাঝে মাঝে গাছের ছায়ায় বসি, পানি খাই আরও হাল্লাক হয়ে পড়ি- শওকত ওসমান)।


এদিকে হরিচরণ অথবা জ্ঞানেন্দ্রমোহনে ‘হাসনাহেনা’ শব্দটি নেই। রাজশেখর বসুর চলন্তিকা অভিধান ও সুবলচন্দ্র মিত্রের সরল বাঙ্গালা অভিধানে বলা হয়েছে শব্দটির মূল জাপানি। আর বাংলা একাডেমির ব্যবহারিক বাংলা অভিধানে শব্দটি মূল হিসেবে দেখানো হয়েছে জাপানি ‘হাস-উ-নো-হানা’। অভিধানটিতে শব্দটির তিনটি বানান রয়েছে- হাসনাহেনা, হাসনুহানা ও হাসনেহিনা। তবে রাজশেখর বসুর চলন্তিকায় বানান একটাই- হাসুনোহানা। বাংলা ভাষায় ‘হাস্নাহেনা’ বানানটিও চালু রয়েছে। জাপানি ভাষায় ‘হাস-উ-নো-হানা’ অর্থ পদ্মফুল। অথচ হাসনাহেনা দেখতে মোটেও পদ্মফুলের মত নয়।


উর্দুতে এই ফুল ‘হুসন-ই-হিনা’ নামে পরিচিত। ‘হুসন’ শব্দটি আরবি। অর্থ সৌন্দর্য বা খুবসুরতি। আবার আরবি হিনা বাংলায় হয়েছে হেনা। হেনা মানে মেহেদি। অন্যদিকে হাসনাহেনার পাতা অনেকটা মেহেদি পাতার মত।


সৈয়দ মুজতবা আলী তা ‘বড় বাবু’ গল্পে লিখেছেন ‘বিহার, উত্তর প্রদেশ, লক্ষ্মৌ, দিল্লি, আজমীর-বরদায় এই ফুলের নাম রাতকী রানী। গুজরাটে রাতনী রানী।’ তবে উর্দু ও আরবি অভিধানে শব্দটি না থাকায় সৈয়দ মুজতবা আলী মত দিয়েছেন শব্দটি জাপানি না হলে কলকাতার উর্দু ভাষাভাষীদের অবদান হতে পারে। মারাঠিতে এই ফুল রাতরানী নামে পরিচিত। এছাড়া ফুলটি ইংরেজিতে night-blooming cestrum, hasna hena, lady of the night, queen of the night, night-blooming jessamine and night-blooming jasmine নামে পরিচিত।


প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, ১৮০০ শতকের শেষ দিকে ওয়েস্ট ইন্ডিজের জঙ্গলে হাইকিংকালে রাগবীর শিং উবহি নামের একজন উদ্ভিদ বিজ্ঞানী গাছটি শনাক্ত করেন। এটা বৈজ্ঞানিক নাম Cestrum nocturnum. nocturnum মানে ‘রাতের’। উইকিপিডিয়ায় শব্দটির আদিনিবাস হিসাবে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও দক্ষিণ এশিয়াকে নির্দেশ করা হয়েছে।


হাসনাহেনা এক প্রকার ছোট সাদা সুগন্ধী ফুল (তবু তুমি জাগো, কখন সকারে করেছে হাসনাহেনা- সাত সাগরের মাঝি, ফররুখ আহমদ)। হাসনুহানা ও হাসনোহানা বানানভেদ। এ শব্দের শেষে হেনা বা হানা থাকায় মনে হতে পারে, হাসনাহেনা শব্দের মূল সম্ভবত আরবি। কিন্তু এ শব্দের মূল জাপানি ‘হাস-উ-নো-হানা’।


অন্যদিকে নারসিসাস ফুল ফারসিতে নরগিস।


লেখাটি লেখকের ব্লগ থেকে নেয়া


বিবার্তা/জিয়া


সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: bbartanational@gmail.com, info@bbarta24.net

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com