হাতি হাতেখড়ি আর হাতেনাতে
প্রকাশ : ২৪ আগস্ট ২০১৭, ১৪:৩৭
হাতি হাতেখড়ি আর হাতেনাতে
জিয়াউদ্দিন সাইমুম
প্রিন্ট অ-অ+

সংস্কৃত ‘হস্তিন্’ থেকে বাংলায় হাতি শব্দটি এসেছে। হাতি মানে হস্তী। অন্যদিকে হাত + ই= হাতি। এ হাতি মানে হস্তপরিমিত (বার হাতি শাড়িও তার কুলায় না), হাতের দিকে (ডান হাতি রাস্তা ধরে পূর্ব দিকে এগোবেন)। সাধারণ অর্থে হাতি শব্দটি তৃণভোজী বৃহদাকার চতুষ্পদ জন্তুর জন্য নির্দেশিত হয়। আবার এ হাতি দিয়ে আলঙ্কারিক অর্থে অতিকায় স্থূল ব্যক্তিও বোঝায় (এতো প্রার্থী নয়, যেন হাতি)।


হাতী বানানভেদ (ঘন সন্দল কাফুরের বনে ঘোরে এ দিল বেহুঁশ। হাতীর দাঁতের সাঁজোয়া পরেছে শিলাদৃঢ় আবলুস- সিন্দাবাদ, ফররুখ আহমদ; কই সে খোজা, হাজার হাতী করলে বা বশ অঙ্কুশে- সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত; পড়িল অর্বুদ সেনা হাতির ঠেলায়- হেয়াত মাহমুদ; হাতিকে মারিতে পারে ভেজিয়া মচ্ছর- সৈয়দ হামজা; হাতি ঘোড়া মাত্তা আলাও লস্কর। উটগাড়ী ভেরা ভেরী আছিল বিস্তর- ফকির গরীবুল্লাহ; দাদালিয়া দাবড়ে চাটি চপ চাপড়ে কামাড় পাড়ে হাতী ঘোড়া- ঘনরাম চক্রবর্ত্তী; রাহুত মাহুত সাজাইল হাতী ঘোড়া- কৃত্তিবাস ওঝা; বদমায়েশি ও টাকা একত্র হলে হাতী পর্যন্ত মারা পড়ে, সেটি বড় সোজা কথা নয়- হুতোম প্যাঁচার নক্শা, কালীপ্রসন্ন সিংহ; বাঘ ভাল্লুক হাতী গয়াল করে চলাফেরা- পূর্ববঙ্গগীতিকা; হাতী যখন ভাবে তার চেয়ে বড় জানোয়ার আর নেই, তখন ছোট একটি মশা তার মগজে কামড়ে কি রকম ‘ঘায়েল’ করে দেয় তাকে- কাজী নজরুল ইসলাম)।


হাতি শব্দের বানানের প্রাচীনতর রূপ হচ্ছে ‘হাথী’। ড. মুহম্মদ এনামুল হক তাঁর ‘আদ্য-পরিচয়’ গ্রন্থের টীকায় শব্দটির বিবর্তন দেখিয়েছেন এভাবে: হস্তী > হত্থী > হাথী > হাতি।


স্তন্যপায়ী এই সামাজিক জীবটি ডাচে olifant, ফিনিশীয়তে elefantti, ফ্রেঞ্চে elephant, জার্মানে elefant আর ইতালিয়ান, পর্তুগিজ ও স্পেনিশে elefante নামে পরিচিত।


এদিকে বালক-বালিকাদের বিদ্যারম্ভের অনুষ্ঠানই হাতেখড়ি। তবে বিদ্যা সম্পর্কিত এ শব্দটি এখন আর এককভাবে বিদ্যার সম্পত্তি নয়। বরং আলঙ্কারিক প্রয়োগটাই এটার মূলানুগ অর্থটাকে ঢেকে দিচ্ছে (ইহার বছর-চারেক পরে যেদিন খুব ঘটা করিয়া অমূল্যের হাতেখড়ি হইয়া গেল- বিন্দুর ছেলে, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়; আমরা য়ুরোপের বৃহস্পতি গুরুর কাজ থেকে প্রথম হাতেখড়ি নিয়েছি, কিন্তু য়ুরোপের শুক্রাচার্য জানেন কী করে মার বাঁচানো যায়, সেই বিদ্যার জোরেই দৈত্যেরা স্বর্গ দখল করে নিয়েছিল- বাঙালির কাপড়ের কারখানা ও হাতের তাঁত, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)। আর আলঙ্কারিক অর্থে হাতেখড়ি মানে কোন কাজ আরম্ভ করা (বাবার কাছেই আমার সঙ্গীতে হাতেখড়ি)।


অন্যদিকে হাতেনাতে মানে চোরাই বা অপহৃত মালসহ। নাতে শব্দটির প্রকৃত রূপ হলো ‘নোতে’। সংস্কৃত ‘লোপত্র’ থেকে নোতে শব্দটির সৃষ্টি। লোপত্র মানে ‘চোরাই মাল’। কিন্তু ‘হাতে’ শব্দের সাদৃশ্যে ‘নোতে’ শব্দটি ‘নাতে’ হয়ে গেছে (তবে এ সকল এর কল্পনা নয়, একেবারে হাতেনাতে প্রত্যক্ষ করা সত্য- শ্রীকান্ত, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়)।


লোকনিরুক্তির (folk-etymology) কারণে শব্দের রূপ অনেক সময় পাল্টে যায়। ‘নোতে’ শব্দটি ‘নাতে’ হয়ে যাবার কারণ এটাই। একই কায়দায় ইংরেজি আর্মচেয়ার (arm chair) বাংলায় আরাম চেয়ার বা আরাম কেদারা এবং ইংরেজি হসপিটাল (hospital) বাংলায় হাসপাতাল হয়ে গেছে। যদিও হাসপাতালের সাথে পাতালের কোনই সম্পর্ক নেই।


লেখাটি লেখকের ব্লগ থেকে নেয়া


বিবার্তা/জিয়া

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: bbartanational@gmail.com, info@bbarta24.net

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com