হস্তী হাজত থেকে হাতা
প্রকাশ : ২৩ আগস্ট ২০১৭, ০৯:১৬
হস্তী হাজত থেকে হাতা
জিয়াউদ্দিন সাইমুম
প্রিন্ট অ-অ+

হস্তী শব্দটি বেশ প্রাচীন। ঋগ্বেদেও শব্দটি রয়েছে। হস্তীর আরেক নাম দন্তী। রামায়ণ ও মনুসংহসিতায় দন্তী শব্দটি রয়েছে। হস্তী যৌগরূঢ় শব্দ। যৌগিক অর্থসমূহের মধ্য থেকে শব্দ যখন বিশেষ কোনো একটিকেই গ্রহণ করে, তখন তাকে বলা হয় যৌগরূঢ় শব্দ। হস্তী শব্দের ব্যুৎপত্তিগত অর্থ ‘যার হস্ত বা হাত আছে।’ হস্ত বা হাত অনেকেরই আছে। কিন্তু হস্তী শব্দটি দিয়ে অন্য কিছু না বুঝিয়ে শুধু তাকেই নির্দেশ করে যার হস্তবৎ শুড় বা হাতের মত শুড় রয়েছে, তার মত একটি বিশেষ জীবকে। এ কারণেই হস্তী শব্দটি যৌগরূঢ়।


হস্তী মানে হাতি, গজ, করী (রথ হস্তী আর কি কাজে তোষার যে বুড়া বলদ আছে- ভারতচন্দ্র রায়গুণাকর; বাঙ্গালায় হস্তীকে কি বলে বলুন দেখি- বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়)।


এক সময় ‘হস্তীমৃগ’ বলতে হাতওয়ালা পশু বোঝাতো। মৃগ বলতে এখন হরিণ বোঝালেও এক সময় মৃগ মানে ছিল পশু। পরে ‘হস্তী’ হয়ে গেল হাতি আর ‘মৃগ’ হয়ে গেল হরিণ। ইংরেজিতেও এক সময় deer বল পশু বোঝাতো। এখন deer মানে হরিণ। শেকসপিয়ারের King Lear নাটকে samll deer মানে ছোট হরিণ নয়, ছোট পশু।


আবার ফারসি থেকেও হস্তী শব্দটি হিন্দিতে ঢুকেছে। হিন্দিতে হস্তী মানে অস্তিত্ব। আর এ থেকে অর্থ দাঁড়িয়েছে গণ্যমান্য কেউ। হিন্দিতে ‘বড় হস্তী’ মানে বড় মাপের গুণী।


হস্তী শব্দের হঠন হচ্ছে সংস্কৃত হস্ত + ইন।


এদিকে বাংলায় একটি ভয়ানক শব্দ হলো হাজত। মানুষ আর যাই কিছু কামনা করুক না কেন, অন্তত পুলিশের মেহমানদারিতে হাজতে থাকার খায়েশ রাখে না। হাজত মানে বিচারের আগে আসামিকে প্রয়োজন মতো আদালতে হাজির করতে পুলিশের জিম্মায় রাখার স্থান। সোজা কথায় থানায়। থানায় মেহমানদারি কে কামনা করে? (শশীকে হাজত হইতে জামিনে খালাস করিলেন- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)।


হাজত আরবি থেকে বাংলায় ঢোকার পর এটা কেন যে মূল অর্থ হারিয়ে ফেলল, তার কোনো ব্যাখ্যা আমাদের কাছে নেই। আরবি হাজত মানে প্রয়োজন, চাহিদা ইত্যাদি (যেমন সালাতুল হাজত)। তাই মূল অর্থে এখন আর হাজতকে খোঁজার প্রয়োজনও নেই। এখন মূল অর্থে হাজতকে নিয়ে যতটুকু প্রয়োজন আর চাহিদা, তা শুধু পুলিশের থাকতে পারে, জনসাধারণের নয়।


অবশ্য বাংলায় হাজত বলতে মূলতবি খাজনা (স্থগিত রাখা যায় এমন রাজস্ব), প্রাকৃতিক ডাক (পেশাব-পায়খানার বেগ) ইত্যাদিও বোঝায়। এ হাজত শব্দটিও আরবি ‘হাজত’ থেকে এসেছে।


আর বাটিযুক্ত দীর্ঘ সরু দণ্ডবিশেষ বা দীর্ঘ হাতলযুক্ত বাটি অর্থে যে হাতা শব্দটি বাংলায় ব্যবহৃত হয়, তার মূল সংস্কৃত ‘হস্ত’ (সেখানে কন্যা সরযূবালা হাতা করিয়া দুধ ঢালিতেছিল, জননীর বিবর্ণ মুখ লক্ষ্য করিল না- চন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়; হাতা বেড়ি ঝাঁটা কলসীর পরিবর্ত্তে, সূচ সূতা কার্পেট কেতাব হইয়াছে, পরিধেয় আটু ছাড়িয়া চরণে নামিয়াছে- প্রাচীনা এবং নবীনা, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়)। শব্দটির বিবর্তন হচ্ছে হস্ত > বাংলা হাত + আ।


হাতার সংস্কৃত সমতুল শব্দ হচ্ছে দর্বি। পল্লীকবি জসীম উদ্দীনের কবিতায় রন্ধনের উপকরণ হাতার ব্যবহার রয়েছে (ইচ্ছে করে উহাদের মুখে হাতা পুড়াইয়া দাগে)।


সংস্কৃত ‘হস্ত’ থেকে আসা হাতা শব্দটি দিয়ে জামার আস্তিন (ফুল হাতা জামা), বাঘ প্রভৃতি জীবের নখরযুক্ত সামনের পা বা থাবাও বোঝায় (‘হাত’ শব্দকে নির্জীব পদার্থ সম্বন্ধে ব্যবহার কালে তাহাকে তির্যক করিয়া লওয়া হইয়াছে, যেমন জামার হাতা, অথবা পাকশালার উপকরণ হাতা- বাংলা শব্দতত্ত্ব, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)।


আরবি ‘ইহাতাহ’ থেকেও আদিস্বর লোপে বাংলায় হাতা শব্দটি এসেছে। এ হাতা অর্থ সীমা, এলাকা, ঘর লাগোয়া বেষ্টিত জায়গা (বাড়ির হাতা)। হাথা বানানভেদ। তবে আলঙ্কারিক অর্থে এ হাতা শব্দটি দিয়ে দখল বা অধিকার বোঝায়।


সংস্কৃত ‘হন্তা’ থেকেও বাংলায় হাতা শব্দটি এসেছে, যার মধ্যযুগের বাংলায় ব্যবহৃত হতো। এ হাতা অর্থ বাধা, প্রতিবন্ধক (হতে এলি হাতা- ঘনরাম চক্রবর্ত্তী)।


লেখাটি লেখকের ব্লগ থেকে নেয়া


বিবার্তা/জিয়া


সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: bbartanational@gmail.com, info@bbarta24.net

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com