‘ডিজিটাল মানুষ’ ও তার পেছনের মানুষ
প্রকাশ : ২৭ জুন ২০১৮, ১৭:০৯
‘ডিজিটাল মানুষ’ ও তার পেছনের মানুষ
উজ্জ্বল এ গমেজ
প্রিন্ট অ-অ+

মো. খন্দকার আলিফ, খন্দকার অলি উল আজম (অলি) ও খন্দকার কাফি আনান তিন ভাই। থাকেন ঢাকায়।


একদিন কলেজ না থাকাতে বাসায় সারাদিন কাজ করে ঘুমিয়ে পড়েন আলিফ। ছোট ভাই আনান স্কুল শেষে বাসায় ফিরে বেল দিতে থাকেন। কিন্তু ঘুমের ঘোরে অলিফ তা শুনতে পাননি। আনান অনেকক্ষণ ডাকাডাকি ও অপেক্ষাশেষে সিদ্ধান্ত নিলেন তালা মিস্ত্রি ডেকে এনে দরজা খুলবেন। কিন্তু সমস্যা হলো, এই ব্যস্ত শহরে কোথায় গেলে অল্প সময়ে মিলবে তালা মিস্ত্রির সন্ধান!


খুঁজে খুঁজে ক্লান্ত হয়ে গেলেন আনান। কিন্তু মিস্ত্রির সন্ধান আর মিললো না। হতাশ মনে বাসায় ফিরে দেখেন, আলিফ ঘুম থেকে উঠেছেন। আনানের মেজাজটা তখন পুরো আকাশে। তবুও কথা কাটাকাটি হবে ভেবে ক্লান্ত আনান না-খেয়েই ঘুমিয়ে পড়েন।


এমন ঘটনা তাঁদের প্রায়ই ঘটতো। একদিন তিন ভাই মিলে চিন্তা করেন এর সমাধান করা যায় কীভাবে। তখন আলিফের মাথায় আসে ‘তালা মিস্ত্রি’ খুঁজে পাওয়ার একটা অ্যাপ বানানোর কথা। আলিফের সাথে একমত হন অলি ও আনান। সেই থেকে শুরু ‘ডিজিটাল মানুষ’ অ্যাপের পথ চলা।



সহজে বিভিন্ন ধরনের সেবা এক প্ল্যাটফর্ম থেকে পেতে তিন উদ্যোক্তা মিলে চালু করেছেন ব্যতিক্রমী উদ্যোগ ‘ডিজিটাল মানুষ’ সেবাটি।


সম্প্রতি রাজধানীর ড্যাফোডিল ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাসের ‘ডিজিটাল মানুষ’ অ্যাপের অফিসে বিবার্তার সাথে আড্ডা জমে খন্দকার আলিফের। ওই আড্ডাতেই আলিফ জানালেন 'ডিজিটাল মানুষ' অ্যাপের শুরু থেকে নানা ঘাতপ্রতিঘাত পেরিয়ে এ পর্যন্ত আসার কথা।


প্রতিদিনকার নানা সমস্যা সমাধানের অ্যাপভিত্তিক প্লাটফর্ম ‘ডিজিটাল মানুষ’-এর প্রধান নির্বাহী ও প্রতিষ্ঠাতা মো. খন্দকার আলিফ। ডিপ্লোমা ইন সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে পড়াশোনা করছেন ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে। বড় ভাই অলি উল আজম পড়ছেন আহসান উল্লাহ ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজিতে ৩য় বর্ষে ইইই বিষয় নিয়ে। ছোট ভাই খন্দকার কাফি আনান পড়ছেন ঢাকার গভর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি হাই স্কুলের ১০ম শ্রেণীতে।


প্রথম বর্ষ থেকেই অটোকাড ও থ্রিডিএস ম্যাক্স নিয়ে অনুশীলন করতেন আলিফ। এই সফটওয়্যারগুলোতে দক্ষতা অর্জনের পর নিজের করা কাজগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে প্রকাশ করতেন। আলিফ ভিজিউলাইজার এবং ডিজাইনার হিসেবে অনেক ইন্টেরিওর ফার্মে পার্ট টাইম জব করেছেন। কিন্তু শুধু গ্রাফিক্সে কাজ করে বসে থাকেননি, পাশাপাশি কাজ করেছেন নানারকম সফটওয়্যার নিয়ে। ক্লাস টেন থেকেই কম্পিউটারে পারদর্শী ছিলেন আলিফ। শুধু তাই নয়, কম্পিউটার, ল্যাপটপ ও মোবাইল সার্ভিসিংও করতেন। এ পর্যন্ত বিভিন্ন কম্পানির জন্য ২০ টিরও বেশি অফিস সাহায্যকারী সফটওয়্যার তৈরি করেছেন। আর ওই অর্থ দিয়েই তৈরি করেছেন ‘ডিজিটাল মানুষ’ অ্যাপ। অন্যদিকে, অ্যাপটির কারিগরি বিষয়গুলোকে আরও উন্নত করতে গত কয়েক বছর ধরে নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন অলি ও আনান।



মুক্তিযোদ্ধার সন্তান হিসেবে ছোটবেলায় বাবার মুখে শোনা ১৯৭১ সালের আত্মত্যাগের গল্পগুলো থেকে দেশ ও মানুষের জন্য কিছু একটা করার স্বপ্ন দেখতেন আলিফ। সেই স্বপ্ন বাস্তাবায়নের অংশ হিসেবে তৈরি করেছেন ‘ডিজিটাল মানুষ’ অ্যাপ প্লাটফর্মটি। তাঁর মতে, শ্রমজীবী বা পেশাজীবী মানুষের পরিশ্রমেই গড়ে ওঠে একটি দেশ। তাঁদের পরিশ্রমকে লাঘব করতে এবং তাঁদের উপযুক্ত সম্মান ও সুবিধা দিতে কাজ করবে এই অ্যাপভিত্তিক প্লাটফর্মটি।


‘ডিজিটাল মানুষ’ একদল তরুণের স্বপ্ন। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় অ্যাপভিত্তিক সার্ভিস প্ল্যাটফর্ম। এটিএমন একটি অ্যাপসভিত্তিক সার্ভিস প্ল্যাটফর্ম, যেখানে সার্ভিস প্রোভাইডার ও ক্লায়েন্টরা তাঁদের প্রয়োজনীয় সার্ভিসটি আদান-প্রদানের জন্য সংযুক্ত হয়ে থাকেন। 'ডিজিটাল মানুষ' সার্ভিস প্রোভাইডার এবং সার্ভিস ভোক্তাদের মধ্যে একটি ব্যাপক নেটওয়ার্ক নির্মাণ করার জন্য কাজ করে যাচ্ছে।


কর্মব্যস্ত নাগরিক জীবনে মানুষকে প্রতিনিয়ত হাজারো সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। যেমন, কারো বাসার ফ্রিজটি কাজ করছে না, ওভেনের সুইচ নষ্ট, বৈদ্যুতিক লাইনে ত্রুটি বা কারো টয়লেটের ফ্লাশটি কাজ করছে না। আশপাশেও পরিচিত কেউ নেই। এসব জটিল সমস্যার সমাধান দিতে ইলেকট্রিশিয়ান, প্লাম্বার, এসি সার্ভিসিং, গ্যাস টেকনিশিয়ান, ওয়াটার ট্যাপ, ট্যাঙ্ক সার্ভিসং, বাড়ি বা অফিস স্থানান্তর, আইটি সার্ভিস, ওয়েব ডিজাইন ও ডেভলপমেন্ট, ইন্টেরিওর ডিজাইনসহ ৮০ টিরও বেশি ধরনের সার্ভিস নিয়ে কাজ করছে 'ডিজিটাল মানুষ'। এখন ফোনে কয়েকটি বাটন চেপেই নিমেষেই এসব সমস্যার সমাধান করা যাচ্ছে। আর এসব সমস্যার সামধান দিতে রয়েছে এক ঝাঁক ডিজিটাল মানুষ।



বর্তমানে অ্যাপটির ব্যবহারকারীর সংখ্যা দাঁড়িয়ে ৪২ হজারেরও বেশি। ৮০ টিরও বেশি সার্ভিস ক্যাটাগরিতে সার্ভিস দিচ্ছেন সাড়ে ছয় হাজার বিভিন্ন শ্রেণির কর্মী। এতে রয়েছে ১,৪৫০টি রিভিউ এবং ২৯ হাজারেরও বেশি সার্ভিস কল। ঢাকা শহরে ৯০টি স্থানে, চট্টগ্রাম, সিলেট, ময়মনসিংহ, নারায়ণগঞ্জসহ সারাদেশের ১৯৩ এলাকা এবং ভারতের ভোপাল শহরে কাজ করছে সেবাটি।


'ডিজিটাল মানুষ' সেবাটি আরও উন্নত ও সহজ করে তুলতে এবং এর পরিধি বাড়াতে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন এক দল তরুণ প্রকৌশলী, যারা এখনো বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশুনা করছেন।


তিন ভাইয়ের টিউশনি, পার্টটাইম জব ও অ্যাপ ডেভেলপ করে যে টাকা আয় হতো তাতেই চলতো সেবাটির ম্যানেজমেন্টর সব খরচ। প্রাথমিকভাবে সরকারি বা বেসরকারি কোনো প্রতিষ্ঠান আর্থিক সহায়তা করেনি। তবে সম্প্রতি ডিজিটাল মানুষ লিমিটেড বাংলাদেশ ভেঞ্চার ক্যাপিটাল থেকে ফান্ড নিয়েছে। ডিজিটাল মানুষ জিপি এক্সসিলারেটরের পঞ্চম ব্যাচের টিম। জিপি এক্সসিলারেটর থেকেও সিড ফান্ড পাবে ডিজিটাল মানুষ।


সেবাটি ২০১৭ সালের ১১মে ইন্টার ইউনিভার্সিটি সফটওয়্যার অ্যান্ড হার্ডওয়্যার কম্পিটিশনে প্রথম স্থান অর্জন করে। ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিক-এর চেয়ারম্যান কাইয়্যুম রেজা চৌধুরীর হাত থেকে পুরস্কার গ্রহণ করে ডিজিটাল মানুষ টিম। এরপরে একই বছরে উদ্যোগটি ফাউন্ডেশন কর্তৃক আয়োজিত এমবিলিয়নথ সাউথ এশিয়া অ্যাওয়ার্ড-২০১৭ লাভ করে। টিমের পক্ষে পুরস্কারটি গ্রহণ করেন অ্যাপটির প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মাদ খন্দকার আলিফ ও সাজিদ হাসান সজিব এবং ডিজিটাল মানুষ অ্যাপের উপদেষ্টা, মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দফতরে কর্মরত কর্মকর্তা আমিন উদ্দিন জীবন।



এছাড়াও উদ্যোগটি ঢাকা জেলা প্রশাসনের আয়োজনে ডিজিটাল উদ্ভাবনী মেলা-২০১৮’তেও শ্রেষ্ঠ তরুণ উদ্ভাবকের পুরস্কার অর্জন করে।


আলিফ বলেন, আমরা শুধু ডিজিটাল বাংলাদেশই নয় বরং একটি উত্তম বসবাসযোগ্য বাংলাদেশ তৈরি করতে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি, যেখানে সমস্যাটির সমাধান হবে শুধু একটি ক্লিকে। তরুণদের স্বপ্নগুলোর বাস্তব রূপই ‘ডিজিটাল মানুষ’। এটি একটি স্বপ্ন। স্বপ্নটি বাস্তবে রূপ দান করা সরকার বা কোনো মুষ্টিমেয় ব্যক্তি বিশেষের পক্ষে কখনো সম্ভব হবে না, যদি সাধারণ নাগরিক এগিয়ে না আসে। দেশকে ডিজিটাল করার লক্ষ্যে নিবেদিত হাজারো উদ্যোক্তার মাঝে কিছু উচ্চাকাঙ্খী সাহসী তরুণের সমাজসেবামূলক উদ্যোগেই ডিজিটাল মানুষ অ্যাপটি তৈরি করা হয়েছে।


ইতোমধ্যেই অ্যাপটির বাণিজ্যিক সংস্করণ চালু করার প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। ২০১৯ সালের মধ্যে সেবাটি বাংলাদেশের ৬৪টি জেলায় ছড়িয়ে দেয়া হবে। আশা করা হচ্ছে, সেবাটির মাধ্যমে ২০১৯ সাল নাগাদ ৫০ হাজার নতুন সার্ভিস প্রভাইডারের কর্মসংস্থান সম্ভব হবে। এটি ৫ কোটি মানুষের জীবনকে সহজতর করে তুলতে সক্ষম হবে। আগামী ২০২১ সালের মধ্যে ডিজিটাল বাংলাদেশের দক্ষ মানুষ তথা ডিজিটাল মানুষের সন্ধান মিলবে। এই ডিজিটাল ও দক্ষ জনশক্তি বিদেশে রপ্তানি করে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের পথও সুগম হবে।


বিবার্তা/উজ্জ্বল/হুমায়ুন/মৌসুমী

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: bbartanational@gmail.com, info@bbarta24.net

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com