​আগে নিজেকে প্রস্তুত করুন, পরে কাজে হাত দিন : ফারুক খান
প্রকাশ : ২৩ এপ্রিল ২০১৮, ১৬:৪৩
​আগে নিজেকে প্রস্তুত করুন, পরে কাজে হাত দিন : ফারুক খান
উজ্জ্বল এ গমেজ
প্রিন্ট অ-অ+

ইন্টারনেটকে ক্যারিয়ার হিসেবে বেছে নেয়ার কোনো চিন্তাই ছিল না তাঁর। অন্য পাঁচটা সাধারণ কিশোরের মতোই তাঁরও স্বপ্ন ছিল গ্র্যাজুয়েশন শেষ করে একটা সরকারি চাকরি করার। চাকরির জন্য বেশ কয়েক জায়গায় চেষ্টাও করেছেন। কিন্তু নানান প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে জীবনের প্লট যায় বদলে।


বর্তমানে তিনি বেসিস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি অ্যান্ড ম্যানেজমেন্টে (বিআইটিএম) আইটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের শিক্ষকতা করছেন। তিন বছরে প্রায় দুই হাজার ছাত্র-ছাত্রীকে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন তিনি।


বলছিলাম এসইও এবং অ্যাফিলিয়েট মার্কেটিংয়ের লীড ট্রেইনার মো. ফারুক খানের কথা। দুই বোন, এক ভাইয়ের মধ্যে তিনি সবার ছোট। বাবা মো. শাহজাহান খান এবং মা পারভীন আক্তার। স্ত্রী নাইমা আক্তার তিশা ও পাঁচ বছরের মেয়ে আয়েশাকে নিয়ে তার সুখী পরিবার।


ছোটবেলায় মাদ্রাসায় প্রাথমিক শিক্ষা নিয়ে হাইস্কুল শুরু করেন খুলনা সেন্ট যোসেফ হাইস্কুলে। মিশনারী স্কুলের নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধ গঠনমূলক শিক্ষা তাকে অন্যরকমভাবে তৈরি করেছে। ছেলের পড়াশুনার প্রতি নিষ্ঠা ও মনোযোগ দেখে বাবা-বা কখনো কোনো নির্দিষ্ট কিছু হওয়ার বিষয়ে চাপ দেননি। তারা চাইতেন ছেলে লেখাপড়া শেষে একটা সম্মানজনক পেশা বেছে নেবে। ওই স্বাধীনতার মূল্য দিয়েছেন ফারুক। নিজে থেকেই বেছে নিলেন কম্পিউটার সায়েন্সকে। হলেন প্রকৌশলী।



গ্র্যাজুয়েশন শেষ করে জীবনের প্রয়োজনে একটা সরকারি চাকরির জন্য অনেক চেষ্টা করেন। না হওয়াতে বেকার প্রকৌশলীর অন্যতম বড় প্লাটফর্ম মুক্ত পেশা ফ্রিল্যান্সিং করার চিন্তা করেন ফারুক। ২০১৪ সালে ছাত্র হিসেবে প্রশিক্ষণে যোগ দেন রাজধানীর বিআইটিএম-এ ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে। ইচ্ছা ছিল ফ্রিল্যান্সিং ক্যারিয়ার গড়ার। প্রশিক্ষণ নিয়ে চলে যান জন্মস্থান খুলনাতে। এর মাঝে একদিন বিআইটিএম-এর প্রশিক্ষক আল আমিন চৌধুরি তাঁকে প্রশিক্ষক হিসেবে কাজ করার অফার দিলে রাজি হয়ে যান তিনি।


সেই থেকে ফ্রিল্যান্সিংয়ের প্রশিক্ষক হিসেবে বিআইটিএম প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে শিক্ষকতা করছেন এই তরুণ প্রশিক্ষক। বর্তমানে তিনি এসইও এবং অ্যাফিলিয়েট মার্কেটিংয়ের লীড ট্রেইনার হিসেবে কাজ করছেন। একই সাথে তিনি এসইও স্কুলবিডি নিজের ওয়েবসাইটের মাধ্যমে বিভিন্ন কম্পানিকে সার্ভিস দিচ্ছেন। অ্যামাজন অ্যাফিলিয়েট মার্কেটিং নিয়ে কাজ করছেন। এভাবেই ব্যস্ততায় জীবন চলছে তাঁর।


জীবনের টার্নিং পয়েন্ট বিষয়ে ফারুক বলেন, ডিপ্লোমা শেষ করে গ্রাজুয়েশন করার আগেই বিয়ে করে ফেলি। পরিবারে বাবাই ছিল একমাত্র উপার্জনকারী। সংসারে ছিল টানাপোড়েন। নিজেই চলতে পারি না, আবার স্ত্রী। গ্রাজুয়েশন করে আমরা দু’জনে ভাগ্যান্বেষণে চলে আসি রাজধানী ঢাকায় এসে প্রশিক্ষক হিসেবে বেসিসের বিআইটিএম প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে চাকরি শুরু করি।


ফারুকের ভাষায় জীবনে সাফল্যের সংজ্ঞা হলো নির্দিষ্ট কোনো লক্ষ্যে পৌঁছানো নয়। তার মতে, কেউ যদি ব্যাংকে এক কোটি টাকা জমানোর টার্গেট নেন এবং কঠিন অধ্যবসায়ের ফলে তা তিনি জমিয়ে ফেলেন, সেটা তার সফলতা না। তখন তার আরো টাকা আয়ের নেশা জাগবে। অন্য একটা টার্গেট নেবেন তিনি। সাফল্য হলো-পরিবার-পরিজন নিয়ে সুন্দরভাবে বেঁচে থাকার জন্য যা আয় করার দকার তা যদি কেউ করতে সক্ষম হন সেটা হবে তাঁর জন্য সফলতা। তিনি বলেন, আমার কাছে সাফল্য হলো, পরিবারের সবাইকে নিয়ে সুখে থাকা, শান্তিতে থাকা এবং সবাইকে ভাল রাখা।



তিনি বলেন, আমার প্রথম অর্জন হলো, ২০১২ সালে বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটিতে পড়ার সময় স্টুডেন্ট অব দ্য ইয়ার হয়েছিলাম। তখন আবার মাইক্রোসফটের স্টুডেন্ট পার্টনার হিসেবে কাজ করেছিলাম এক বছর। এর স্বীকৃতি হিসেবে সার্টিফিকেটও পেয়েছি। বিআইটিএম-তে প্রশিক্ষণ নেয়ার পরে ভাল রেজাল্ট করার সুবাদে পুনরায় এখানে শিক্ষকতা করার সুযোগ পেয়েছি। এখানে আসার পরে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে প্রশিক্ষণ দেয়ার সুযোগ হয়েছে।


ফ্রিল্যান্সিংয়ের যোগ্যতা বিষয়ে ফারুকের ভাষ্য, ফ্রিল্যান্সিং যারা করবেন তাঁদের অবশ্যই কম করে দুটা যোগ্যতা থাকতে হবে। ইংরেজিতে লেখা, বোঝা ও যোগাযোগ করার দক্ষতা। দ্বিতীয়ত অবশ্যই তাঁকে ধৈর্যশীল হতে হবে। ফ্রিল্যান্সিং করার জন্য কম করেও হলে তিন থেকে ছয় মাস ধৈর্য নিয়ে একটা রুটিন করে নিয়মিত অনলাইনে সময় দিতে হবে। প্রথমে কাজ করার জন্য নিজেকে তৈরি করতে হবে। ফ্রিল্যান্সিংয়ের জন্য খুটিনাটি কারিগরি বিষয়গুলো ভাল করে আয়ত্ত করে নিজেকে দক্ষ করতে হবে। কাজের কোয়ালিটি ভাল করতে হলে দক্ষতার কোনো বিকল্প নাই। ফ্রিল্যান্সিং কাজ আবেদন করার পরে কাজ পেয়ে যদি ক্লায়েন্টের পছন্দমতো কাজ ডেলিভারি দিতে না পরেন, তাহলে আপনার কাজ আর ক্লায়েন্টরা নেবে না। তাই সময় নিয়ে আগে নিজেকে প্রস্তুত করুন। পরে কাজে হাত দিন। এটা এক মাসের বা তিন মাসের কোনো প্রশিক্ষণ না। যতক্ষণ পর্যন্ত নিজেকে প্রস্তুত না করতে পারেন ততদিন শিখে যেতেই হবে। এর জন্য প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ নিতে হবে।


ফ্রিল্যান্সিংয়ের সব চেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো ইংরেজি কমিউনিকেশন গ্যাপ। আমার অভিজ্ঞতায় দেখেছি যে ফ্রিল্যান্সিং করার সময় বায়ারদের সাথে কমিউনিকেশন করতে হয়। তাদের সাথে কথা বলার সময় সঠিক ও শুদ্ধভাবে কথা বলতে পারলে বায়াররা তাঁদের কাজ দেয়ার ব্যাপারে আগ্রহী হন। কারণ তাঁরা কি চাচ্ছেন আর আমি কিভাবে কাজটা করে দিতে পারবো এটাই তাঁদের সঠিকভাবে বোঝাতে না পারলে তো কাজ করা সম্ভব না। এক্ষেত্রে কমিউনিকেশন স্কিলটা অবশ্যই দরকার। দ্বিতীয় চ্যালেঞ্জটা হলো পুরো জ্ঞানের অভাব। আমাদের বেশিরভাগ স্টুডেন্টের থাকে আধা শিক্ষা জ্ঞান। এটা অনেক ভয়ংকর বিষয়। কারণ আজকে একজন একটা বিষয়ে শিখছেন। পাশের একজন যদি বলে এটা থেকে ওইটাতে আরো বেশি আয় করা সম্ভব, তাহলে তিনি আবার আগেরটা রেখে এটাতে চলে যাচ্ছেন।



আগের থেকে দেশের ফ্রিল্যান্সিংয়ের অবস্থা অনেক উন্নত হয়েছে উল্লেখ করে ফারুক বলেন, এই প্লাটফর্মে এখন সারাদেশের অনেক তরুণ-তরুণী কাজ করছেন। অনেকেই এটাকেই জীবিকার প্রধান অবলম্বন হিসেবে নিয়েছেন। অনেক সফল ফ্রিল্যান্সার বাংলাদেশে রয়েছেন। এখনও প্রতিনিয়ত তৈরি হচ্ছে।


দেশের ইন্টারনেটর অবস্থার বিষয়ে আক্ষেপ করে তিনি বলেন, আমরা ফোর জি-র যুগে প্রবেশ করেছি। কিন্তু নেটের গতি সব জায়গায় সমান না। আর ইন্টারনেটের দামও অনেক বেশি। এ বিষয়গুলোর প্রতি সরকার নজর দিলে ভাল। আর টাকা ট্রান্সফারের বিষয়টাও ভাববার বিষয়। আমাদের দেশে জুমশেফারের যে প্যাপাল সেবা চালু হয়েছে সেটা টাকা লেনদেনে বেশি সুবিধাজনক না। এটা আরও উন্নত করলে ভাল হতো।


নিজের স্বপ্ন বিষয়ে ফারুক বলেন, আমার এমন একটা ট্রেনিং প্লাটফর্ম করার ইচ্ছা যেখানে স্টুডেন্টরা আসবে প্রশিক্ষণ নেবেন যতদিন না কোন একটা প্লাটফর্মে দাঁড়াতে না পারছেন ততদিন পর্যন্ত এখানেই থাকবেন। কাজ পেয়ে পরে যাবেন। আর অনলাইন ট্রেনিং প্রোগ্রামটা চালিয়ে নেয়ার ইচ্ছা সব সময়।


বিবার্তা/উজ্জ্বল/হুমায়ুন/মৌসুমী

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: bbartanational@gmail.com, info@bbarta24.net

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com