সফটএভারকে বিশ্বসেরা বানাতে চান আরাফাত রহমান
প্রকাশ : ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ১৬:৫৩
সফটএভারকে বিশ্বসেরা বানাতে চান আরাফাত রহমান
উজ্জ্বল এ গমেজ
প্রিন্ট অ-অ+

ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলার কাইচান গ্রামে জন্ম তাঁর। ছোটবেলা থেকেই সেনাবাহিনীর সদস্য হয়ে দেশের সেবা করার খুব ইচ্ছে ছিল। তাই পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ার সময়ে স্কাউট দলে যোগ দেন। তখন থেকে মাদরাসার পিটি-প্যারেডে নিয়মিত নেতৃত্ব দিতেন। অন্যদিকে বাবা-মায়ের ইচ্ছে ছিলো তাঁকে মাওলানা বানানোর। কিন্তু সময়ের বাঁকে এসে তাঁদের সবার সে ইচ্ছেই যায় বদলে। আরাফাত হয়ে উঠেন একজন সফল উদ্যোক্তা।


এ আরাফাত রহমান সফটওয়্যার নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ‘সফটএভার’-এর প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা। সম্প্রতি এক আড্ডায় কথা হয় তরুণ এই উদ্যোক্তার সাথে। কথায় কথায় তিনি জানান, প্রবাসী বাবা মুজিবুর রহমান পেশায় একজন চাকুরে আর মা গৃহিনী। এক ভাই ও বোনের মধ্যে ছোট তিনি।


২০০৮ সাল। দেশে তখনো থ্রি জি সেবা আসেনি। গ্রামগঞ্জে তখন সবগুলো অপারেটরের নেটওয়ার্ক পৌঁছায়নি। এমন একটা সময়ে ৬ষ্ঠ শ্রেণীর ছাত্র আরাফাত প্রবাসী বাবার দেয়া প্রথম মাল্টিমিডিয়া মোবাইলের মাধ্যমে ইন্টারনেটের সংস্পর্শে আসেন। টিফিনের টাকা জমিয়ে ইন্টারনেটের ডাটা কিনতেন আর গুগল সার্চ করে নতুন কিছু শেখার চেষ্টা করতেন। ২০১১ সালের প্রথম দিকে জানতে পারেন ফ্রিল্যান্সিংয়ের মাধ্যমে টাকা আয় করা যায়।



২০১২ সালে আজমল নামে এক বড় ভাইয়ের সাথে পরিচয় হয় তাঁর। পেশায় সাংবাদিক হলেও ওয়েব ডেভেলপের বিষয়গুলো খুব ভালোভাবে জানা ছিল তাঁর। তাঁকে দেখে ও তাঁর কথা শুনে ওয়েব ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট শিখতে আরো বেশি আগ্রহী হন আরাফাত। এরপর ইউটিউবে সার্চ করে ভিডিও টিউটোরিয়াল দেখে নিজে নিজে ওয়েব ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্টের কিছু কাজ শিখেও ফেলেন। ২০১৩ সালে মাধ্যমিক পরীক্ষা শেষে শুরু হয় নিজের ল্যাপটপেই ওয়েব ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্টের কাজ শেখা।


আস্তে আস্তে আরাফাত বুঝতে পারলেন একা কাজ না করে দলবদ্ধ হয়ে কাজ করলে বিষয়টা সহজ হবে। তাঁর এক বন্ধু জিহাদুর রহমান নয়ন তখন নবম শ্রেণির ছাত্র। তবে ইন্টারনেট সম্পর্কে তার ভাল জ্ঞান ছিল। ওই সময়েই প্রযুক্তি-বিষয়ক ব্লগগুলোতে তিনি লেখালেখি করতেন। এভাবেই কাজের সঙ্গী পেয়ে গেলেন আরাফাত।


আরাফাত বলেন, ৪-৫ মাসের মধ্যেই আমি ও নয়ন মিলে ‘গ্রিন আইটি বাংলাদেশ’ নামে গ্রাম থেকেই একটি স্টার্ট-আপ শুরু করি। তখন আমার বয়স মাত্র ১৭ বছর। কয়েক মাসের মধ্যেই বেশ কিছু দেশীয় ক্লায়েন্ট পেয়ে যাই। ২০১৪ সালের জানুয়ারিতে ‘গ্রিন আইটি বাংলাদেশ’ নাম পরিবর্তন করে এটির নাম দেই ‘ময়মনসিংহসোর্স’। শুরু হয় আমার উদ্যোক্তা জীবনের নতুন পথ চলা।


উদ্যোক্তা হওয়ার পেছনে কার অবদান সবচেয়ে বেশি এমন প্রশ্নের জবাবে আরাফাত বলেন, আমার বাবা মালয়েশিয়া থাকেন। আমার উদ্যোক্তা হওয়ার পেছনে সবচেয়ে বেশি অবদান মায়ের। আমার ভাল কাজগুলোকে সব সময় মা উৎসাহ ও সমর্থন দিতেন। কখনো উৎসাহ হারিয়ে ফেললে অনুপ্রেরণা যোগাতেন। আমাদের এলাকাটা প্রত্যন্ত অঞ্চলে হওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে ইন্টারনেট সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা ছিল। তবে মায়ের পূর্ণ সমর্থন, সহকর্মীদের আন্তরিক ভালোবাসা এবং নিরলস পরিশ্রমের ফলে আমাকে কোনো বাধাই আটকিয়ে রাখতে পারেনি।



উদ্যোক্তাজীবনের চ্যালেঞ্জের বিষয়ে আরাফাতের ভাষ্য, আমরা যখন অনলাইনের কাজ শুরু করি তখন আমাদের গ্রামে বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেটের কোনো ব্যবস্থা ছিলো না। তাই কম্পিউটার চালানো কিংবা ইন্টারনেট ব্রাউজের জন্য ২ কিলোমিটারেরও বেশি পথ হেঁটে বিরুনিয়া বাজারে যেতাম। তখন ইন্টারনেটের গতি ছিলো ৮-১০ কেবি/সেকেন্ড। বিরুনিয়া বাজার থেকে প্রতিদিন ল্যাপটপ চার্জ দিয়ে বাড়িতে বসে অফলাইনে কাজের অনুশীলন করতাম, আবার বাজারে এসে ইন্টারনেট ব্রাউজ করতাম। তাই গ্রামে থাকার সময়ে আমাদের গ্রাহকদের দ্রুত সেবা দিতে সমস্যা হতো। ২০১৪ সালের শেষের দিকে ময়মনসিংহ শহরে চলে এসে পড়াশোনার পাশাপাশি কাজ চালিয়ে যেতে থাকি।


২০১৬ সালের জানুয়ারি থেকে রিয়াদ হাসানের সাথে মিলে সফটওয়্যারনির্মাতা প্রতিষ্ঠান ‘সফটএভার’ প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা ও উদ্যোগ নেন আরাফাত। ওই বছরের শেষের দিকে প্রতিষ্ঠানটি আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করে। সফটওয়্যার নির্মাতা প্রতিষ্ঠান হলেও পাশাপাশি এখানে মোবাইল অ্যাপস ডেভেলপমেন্ট, ওয়েব ডেভেলপমেন্ট ও ডিজিটাল মার্কেটিং নিয়েও কাজ করা হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য, জাপানসহ কয়েকটি দেশের বেশকিছু প্রতিষ্ঠানের পার্টনার হিসেবে কাজ করছে সফটএভার। ১০ টিরও বেশি দেশে আইটি সেবা দিচ্ছি প্রতিষ্ঠানটি। এ ছাড়া সফটএভার-এর আরও দুটি অঙ্গ প্রতিষ্ঠান রয়েছে। একটি দেশের শীর্ষস্থানীয় ডোমেইন-হোস্টিং সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান ‘হোস্টঅ্যারোমা’ আর একটা নেটওয়ার্কিং ও সিকিউরিটি সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান ‘এভার কমিউনিকেশনস’ ।


আরাফাত বলেন, বর্তমান সরকারের ডিজিটাল বাংলাদেশ নির্মাণে কাজ করে যাচ্ছে সফটএভার। কারণ আমরা বিশ্বাস করি, মফস্বল অঞ্চলকে ডেভেলপ করতে পারলেই প্রকৃত ডিজিটাল বাংলাদেশ নির্মাণ সম্ভব হবে।


নতুন উদ্যোগ ‘সফটএভার’-এর কাজের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে এই উদ্যোক্তা বলেন, কাজে অবশ্যই প্রতিবন্ধকতা আসবে এবং সমস্যার সম্মুখীন হতে হবেই। আর নতুন উদ্যোগ হলে তো কথাই নেই, হাজারো সমস্যা আর চ্যালেঞ্জ। তাই বলে থেমে যাওয়া ঠিক নয়। কাজ করতে অথবা উদ্যোগ নিতে গেলে অবশ্যই ধৈর্য প্রয়োজন। মেধা, ধৈর্য ও সততার সঙ্গে নিজের কাজটি করতে হবে। আমরা যখন কাজ শুরু করি তখন ইন্টারনেট স্পিড খুব কম ছিল, আবার অনেক সময় ইন্টারনেট থাকত না, ছিল না কোনো বিনিয়োগ। কিন্তু তারপরও ধৈর্যহারা না হয়ে এগিয়ে গিয়েছি। উদ্যোক্তাজীবনে নিজের চারপাশ থেকে শেখার ও পর্যবেক্ষণের বিষয়টিও জড়িত। নিজেকে প্রতিনিয়ত পরিবর্তন করতে হয়, নতুন কিছু শিখতে হয়।



বর্তমান উদ্যোক্তাদের অবস্থার মূল্যায়ন করে আরাফাত বলেন, বাংলাদেশে আইটি উদ্যোক্তাদের অবস্থা অনেক ভালো যে তা বলা যাবে না। তবে মোটামুটি খারাপও না। দেশে আইটির বেশ বড় একটা বাজার তৈরি হলেও দক্ষ জনবল আর মানসম্মত প্রতিষ্ঠানের অভাব রয়েছে। অপরদিকে ব্যাংকিংয়ে বড় ধরণের একটি সমস্যা, কোনো ব্যাংকই সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠানগুলোকে লোন দেয় না। এমনকি মোবাইল ব্যাংকিং সেবা বিকাশও তাদের অ্যাকাউন্ট খুলতে দেয় না।


সরকারের প্রশংসা করে আরাফাত বলেন, বর্তমান সরকারের আমলে আমাদের আইটি ইন্ড্রাস্ট্রির অনেক উন্নয়ন হয়েছে। বিশ্ববাজারে বেশ বড় একটা স্থান দখল করে আছি আমরা। তবে সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠানগুলোর সবচেয়ে বড় ক্রেতা হলো সরকার। এখন সরকার যদি বেশিমূল্যে বিদেশ থেকে নিম্নমানের সফটওয়্যার ক্রয় করে, আমাদের দেশের মানসম্মত প্রশিক্ষক ও পর্যাপ্ত ট্রেনিং ব্যবস্থা থাকতেও বিদেশের কোনো প্রতিষ্ঠানকে ট্রেনিংয়ের দায়িত্ব দেয় এবং সেই ট্রেনিং কিংবা সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট আমাদের দেশের কর্মী দ্বারাই সম্পন্ন হয় তাহলে আমাদের দেশের আইটি ইন্ডাস্ট্রি সামনে বড় হুমকির মুখে পড়বে।


দেশে উদ্যোগ শুরু করেও হারিয়ে যাওয়ার পেছনের কারণ হিসেবে আরাফাত বলেন, সঠিক পরিকল্পনা, যোগ্য নেতৃত্ব, দক্ষ জনবলের অভাবে এমনটা হচ্ছে। যেহেতু এই ইন্ডাস্ট্রিটা আমাদের দেশে নতুন সেহেতু অনেকেই মনে করেন আইটি মানেই অনেক টাকা এবং সাম্প্রতিককালে আমাদের দেশের তরুণ প্রজন্মকে মোটিভেশন দিয়ে উদ্যোক্তা হতে আগ্রহী করে তোলা হচ্ছে। আমি মনে করি, উদ্যোক্তা একটা প্রতিভা। আমার যা করতে মন চায় তা-ই করা উচিত। কে কি বলল আর কে কি ভাবল সেদিকে মনযোগ না দিয়ে নিজের মতো করে কাজ করা দরকার। সকলেই যদি উদ্যোক্তা হয় তাহলে দেশের অন্যান্য কাজকর্ম করবে কে ?


এই উদ্যোক্তা মনে করেন, একজন উদ্যোক্তার সফলতায় পৌঁছতে কমপক্ষে দু' বছর সময় লাগে। যেহেতু এই ইন্ডাস্ট্রি অনেক চ্যালেঞ্জের, সেহেতু সঠিক পরিকল্পনা, যোগ্য নেতৃত্ব ও দক্ষ জনবল নিয়ে শুরু করা উচিত। যে কোনো নতুন উদ্যোগে নতুনত্ব দরকার। তাই নতুন নতুন উদ্যোগগুলো কোনো ইনোভেশনকে ঘিরে হলে কাজ করা অনেক সহজ হবে।


নিজের প্রতিষ্ঠান নিয়ে স্বপ্ন অনেক আরাফাতের। সে স্বপ্ন পূরণের পথেই হাঁটছেন তিনি। যতই এগিয়ে যাচ্ছেন সামনে আরো নতুন পথ ও সম্ভাবনা দেখতে পাচ্ছেন। তিনি বলেন, আমার পরিকল্পনা রয়েছে সফটএভার-এর কাজের পরিধি আরো বিস্তৃত করা। দেশের এবং বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান হতে চাই আমরা।


বিবার্তা/উজ্জল/হুমায়ুন/মৌসুমী

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: bbartanational@gmail.com, info@bbarta24.net

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com