মাহবুব শাহীর ডাটা রিকভারি স্পেশালিস্ট হয়ে ওঠার গল্প
প্রকাশ : ০৫ নভেম্বর ২০১৭, ১৭:২৮
মাহবুব শাহীর ডাটা রিকভারি স্পেশালিস্ট হয়ে ওঠার গল্প
উজ্জ্বল এ গমেজ
প্রিন্ট অ-অ+

২০০৪-০৫ সালের দিকের কথা। মাহবুব শাহীর বাবা স্থানীয় প্রথম দৈনিক পত্রিকা ‘দৈনিক ব্রাহ্মণবাড়িয়া’র সম্পাদক ও প্রকাশক। তাঁর অফিসের কম্পিউটারের হার্ডডিস্ক নষ্ট হয়ে গেছে। তা নিয়ে ভীষণ দুশ্চিন্তায় পড়েন বাবা। কোনোভাবেই ওই হারানো তথ্য-উপাত্ত পুনরুদ্ধার করতে পারছিলেন না। বিষয়টা খুব নাড়া দেয় মাহবুব শাহীকে। তখনই এ নিয়ে গবেষণা শুরু করেন তিনি। শুরু হয় তার পথ চলা। নিরলস সাধনা আর অক্লান্ত পরিশ্রমে তিনি আজ হয়ে উঠেছেন ডাটা রিকভারি স্পেশালিস্ট ও ট্রেইনার।


সম্প্রতি রাজধানীর মিরপুর থানার রূপনগরে ডাটা রিকভারি স্টেশনে (ডিআরএস) বিবার্তার সঙ্গে দীর্ঘ আড্ডায় বেরিয়ে আসে তাঁর ডাটা রিকভারি স্পেশালিস্ট হয়ে ওঠার গল্প। বিবার্তা পাঠকদের ওই গল্প জানাচ্ছেন উজ্জ্বল এ গমেজ।


স্কুলজীবন থেকেই হার্ডওয়্যারের প্রতি বিশেষ ঝোঁক ছিল মাহবুবের। ২০০১ সালের কথা। মাত্র কলেজে পা রেখেছেন। তখনই কম্পিউটারে যেকোনো সমস্যা হলে নিজে নিজেই সমাধান করার চেষ্টা করতেন। পাশাপাশি অন্যদের সমস্যাও সমাধান করে দিতেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার এই তরুণ। পড়াশোনার পাশাপাশি এই ছিল মাহবুব হোসেনের প্রতিদিনের কাজ।


উচ্চমাধ্যমিক শেষ কেরে ২০০৩ সালে বাড়িতে ইন্টারনেটের সংযোগ নেন মাহবুব। এরপর আরও বাড়িয়ে দেন শেখার সাধনাটা। ইন্টারনেটে এ বিষয়ক নানা লেখা পড়তে পড়তে তিনি একপর্যায়ে ডাটা রিকভারি বিশেষজ্ঞদের একটি বৈশ্বিক অনলাইন গ্রুপের খোঁজ পান। এটাই তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।



২০০৬ সালে স্যালভেশন ডেটা ম্যাক্সটর ফ্রেমওয়্যার রিপেয়ার নামক সফটওয়্যারের ডস সংস্করণের গ্রাহক হন। পরের বছর গ্রাহক হন উইন্ডোজ সংস্করণের। সে থেকেই মুক্ত পেশাজীবী (ফ্রিল্যান্সার) হিসেবে মাহবুব কাজ শুরু করেন ডাটা পুনরুদ্ধারের। পাশাপাশি চালিয়ে যান নিজের পড়াশোনা। রাজধানীর ইউনিভার্সিটি অব ডেভেলপমেন্ট অলটারনেটিভ থেকে ব্যবসায় প্রশাসনে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষে ২০১২ সালে হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এক্সিকিউটিভ সেলস অ্যান্ড ট্রাফিক হিসেবে চাকরি নেন। এরপরে ইউনাইটেড এয়ারওয়েজে মানবসম্পদ বিভাগে নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে। তবে বেশি দিন নয়, গ্রাহকদের কাজের অনুরোধে চাকরি ছেড়ে দিয়ে নিজেই প্রতিষ্ঠা করেন ডাটা রিকভারি স্টেশন - ডিআরএস (www.datarecoverystation.com) www.fb.com/datarecoverystation ।


অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে সীমিত সামর্থে অবশেষে রাজধানীতে ডাটা রিকভারির জন্য সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তির হার্ডওয়্যার ও সফটওয়্যার বিদেশ থেকে আমদানি করে ২০১৪ সালে গড়ে তুলেছেন গবেষণাগার। মাহবুবের ভাষায়, বাংলাদেশে একমাত্র আমাদেরই রয়েছে বিশ্বমানের হার্ডডিস্ক ড্রাইভ রিকভারির হার্ডওয়্যার সেটাপ এবং সার্জারি ফ্যাসিলিটি। ডাটা রিকভারি হবে না - শুনতে শুনতে যখন আপনি হতাশ, তখন আমরা আপনাকে আশার আলো দেখাবো ইনশাল্লাহ।


২০১৪ সালের অক্টোবর পর্যন্ত তার প্রতিষ্ঠান দেশেই প্রায় ৬০ শতাংশ সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা অর্জন করে। এ হার শতভাগে উন্নীত করার লক্ষ্যে ডিআরএস ২০১৪ সালের শেষের দিকে হার্ডডিস্ক ড্রাইভের মাইক্রো-সার্জারির কার্যক্রম হাতে নিয়েছে এবং কন্টিনিউ করছেন।



ক্ষতিগ্রস্ত বা নষ্ট হয়ে যাওয়া ডিজিটাল মেমোরি ডিভাইস (হার্ডডিস্ক ড্রাইভ) থেকে তথ্য-উপাত্ত পুনরুদ্ধারে তার জ্ঞান, দক্ষতা ও সাফল্যের জন্য চীনভিত্তিক ডাটা রিকভারি প্রযুক্তি ম্যানুফ্যকাচারার ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট ‘ডলফিন ডাটা ল্যাব’ ২০১৫ সালে মাহবুবকে ‘সার্টিফিকেট অব এক্সিলেন্স’ দিয়েছে। এর আগেও অবশ্য বিভিন্ন জটিল কেস নিয়ে মাহবুব হোসেনের বিশ্লেষণ প্রকাশিত হয় বিশ্বের একাধিক ডাটা রিকভারি প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইট ও প্রকাশনায়। জটিলতম ডাটা রিকভারি কেসগুলোর বিশ্লেষণ, বিশেষজ্ঞ মতামত, কার্যকর সমাধান ও ভুলত্রুটি সম্পর্কে জানার পাশাপাশি নিজের অভিজ্ঞতাও ভাগাভাগি করেছেন সেখানে।


গত আট-দশ বছরে বিদেশ থেকেও আউটসোর্সিংয়ে কাজ এসেছে তার কাছে। দেশেও ব্যক্তি পর্যায়ের গ্রাহক থেকে শুরু করে ছোট-বড় অনেক প্রতিষ্ঠানকে সেবা দিয়েছে তার প্রতিষ্ঠান ডাটা রিকভারি স্টেশন (ডিআরএস)।


শুরুতে নানামুখী চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়েছে মাহবুবকে। যেমন, ক্ষতিগ্রস্ত বা নষ্ট হয়ে যাওয়া ডিজিটাল মেমোরি ডিভাইস (হার্ডডিস্ক ড্রাইভ) থেকে তথ্য-উপাত্ত পুনরুদ্ধার করা যে সম্ভব, এটা মানুষকে বোঝানো সহজ ছিল না। অনেকে বিষয়টাকে পাত্তাই দিতো না। আবার যন্ত্রপাতির সীমাবদ্ধতাও ছিল। টাকার অভাবে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি কেনা সম্ভব হচ্ছিল না। প্রযুক্তির এই সেক্টরটায় ভবিষ্যতে যে অফুরান সম্ভাবনা রয়েছে সেটা না বোঝার কারণে পারিবারিকভাবেও আর্থিক সাহায্য আসেনি। পরবর্তীতে পরিবার বুঝতে না পারলেও ছেলের আগ্রহকে প্রাধান্য দিয়ে তাঁর বাবা বিভিন্ন সময় আর্থিকভাবে সাহায্য করেছেন।


বর্তমানে ডিআরএস দেশের বিভিন্ন মাল্টিন্যাশনাল কম্পানি, ব্যাংক, হার্ডওয়্যার, আইটি ফার্ম, প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং বিভিন্ন বেসরকারি অফিসে ডাটা পুনরুদ্ধারের সেবা দিচ্ছে। এ প্রসঙ্গে মাহবুব বলেন, বিদেশে ডেটা পুনরুদ্ধার করতে ব্যয় হয় অনেক টাকা, এছাড়াও সার্ভিসটি পেতে দেশের বাইরে অনেক সময় ব্যয় হয় । আর ডিআরএসে সেবা নিতে হার্ডডিস্কের ক্ষতির ওপর নির্ভর করে সাধারণত খরচ পড়বে ২,৫০০ থেকে ৫০ হাজার টাকা। সাধারণত হার্ডডিস্কের ক্ষতির ধরনের ওপর নির্ভর করে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ১০০ শতাংশ পর্যন্ত ডাটা পুনরুদ্ধার সম্ভব হয়। কিছু কিছু ক্ষেত্রে হার্ডডিস্কটির কন্ডিশনের ওপর আউটকামটা ব্যতিক্রম হতে পারে।



মাহবুব বলেন, গতানুগতিক যেসব ডাটা রিকভারি সেবা দেয়া হয়ে তার থেকে একটু ব্যতিক্রম সেবা দিয়ে থাকি। গতানুগতিক ডাটা রিকভারি সার্ভিস শুধুমাত্র ভাল অবস্থায় আছে হার্ডডিস্কটি, সফটওয়্যার লেভেলে ডিলেট, ফরম্যাটজাতীয় সাধারণ কাজগুলো করা হয়। কিংবা বেসিক লেভেলের কিছু সার্ভিস দেয়া হয়ে থাকে। যখনি হার্ডডিস্কটি নষ্ট হয়ে যায়, ব্যবহার উপযোগী না থাকে গতানুগতিক সার্ভিসে এইগুলো থেকে রিকভারি সম্ভব হয় না। কেননা তখন প্রয়োজন হয় হার্ডওয়্যার লেভেল এবং সফটওয়্যার লেভেলের সামষ্টিক সার্ভিস। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি, গতানুগতিক সার্ভিস প্রাভাইডাররা অনেক ক্ষেত্রেই তাদের জ্ঞানের এবং টেকনোলজিকাল লিমিটেশনের কারণে অনেক কেইস নষ্ট করে ফেলেন যা পরবর্তিতে স্পেশালাইজড বা এডভান্সড প্রসেসেও রিকভারি সম্ভব হয় না। আমাদের সার্ভিসের স্পেশালাইজেশন হলো, নষ্ট হয়ে যাওয়া হার্ডডিস্ক থেকে ডাটা রিকভারি করা। যেমন, হার্ডডিস্ক হাত থেকে পড়ে যাওয়া, ক্লিকিং বা অস্বাভাবিক শব্দের সৃষ্টি হওয়া, পুড়ে যাওয়া, ডিটেকশন না থাকা, ব্যাড সেক্টর ডেভেলপ হওয়া, স্লো বা ইনএক্সেসিবল ইত্যাদি। মাইক্রোসার্জরী মাধ্যমে ইন্টারনাল ড্যামেজ বা মেকানিক্যাল ফেইল্যুর কিংবা অ্যাডভান্সড লেভেলের অ্যাডভান্সড লেভেলের কম্প্লেক্সিটি থেকে ডাটা পুনরুদ্ধার করা। এছাড়াও রেইড সার্ভার, NAS, SAS HDD, QNAP ইত্যাদি।


তথ্যপ্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির ফলে সারাবিশ্বে বইছে প্রযুক্তির জোয়ার। বাংলাদেশেও এই জোয়ার বইছে দ্রুত গতিতে। এমন ডিজিটাল বাংলাদেশে আগামীতে ডাটা রিকভারি সেবাটির অফুরান সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানান এই তরুণ গবেষক। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, আমাদের দেশে বিষয়টিকে বেশি গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে না। অথচ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ডিজিটাল ষ্টোরেজ বা কম্পিউটারনির্ভরতা যেমন বাড়ছে, ডাটা লসের পরিমাণও বেড়ে চলছে। মেমোরি ডিভাইস ও ডাটার সুরক্ষা সম্পর্কে ব্যবহারকারী, এমনকি সংখ্যাগরিষ্ঠ টেকনিশিয়ানের মধ্যে সচেতনতা ও জ্ঞানের অভাবও এই ক্ষেত্রে অনেকটা দায়ী বলে মনে করেন তিনি।


প্রতিষ্ঠানকে নিয়ে পরিকল্পনা বিষয়ে তিনি জানান, দেশে অনেক মেধাবী তরুণ-তরুণী রয়েছে, যাদের অনেকেই এই বিষয়ে হয়তো জানেন না। আবার জানলেও অনেকের সার্মথ্য না থাকার কারণে ডাটা রিকভারি বিষয়ে প্রশিক্ষণ নিতে পারছেন না। আমি গরিব ও মেধাবী ওই সব শিক্ষার্থীর জন্য ভবিষ্যতে একটি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করার স্বপ্ন দেখি। আর আমি দেশে স্বল্প খরচে ডাটা রিকভারির শতভাগ সেবা নিশ্চিত করতে চাই।


বিবার্তা/উজ্জ্বল/হুমায়ুন/মৌসুমী

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: bbartanational@gmail.com, info@bbarta24.net

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com