পৃথিবীকে টেকনোলজির ‘দ্য নেক্সট বিগ থিং’ উপহার দিতে চাই
প্রকাশ : ১০ জুন ২০১৭, ১৭:২৯
পৃথিবীকে টেকনোলজির  ‘দ্য নেক্সট বিগ থিং’ উপহার দিতে চাই
উজ্জ্বল এ গমেজ
প্রিন্ট অ-অ+

ছোটবেলা থেকেই কম্পিউটারের প্রতি অন্যরকম আকর্ষণ কাজ করতো রন মাহিনুরের মনে। ভেবেছিলেন কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে পড়াশোনা করে একটা ভালো চাকরি নিয়ে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করবেন। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য তিনি ভর্তি হন রাজধানীর ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে।


একদিন একটা প্রোগ্রামে ভার্সিটির চেয়ারম্যান সবুর খান বলেন, ‘আমি চাই আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীরা শুধু চাকরি করবে না, তারা নিজেরা উদ্যোক্তা হবে এবং অন্যদের জন্য চাকরির সুযোগ তৈরি করবে।’


কথাটা মাথায় ঢুকে গেলো মাহিনুরের। সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললেন, যে কোনো মূল্যে উদ্যোক্তা হতেই হবে। যেই ভাবা সেই কাজ। ছাত্রাবস্থায়ই শুরু করেন ছোট একটি আইটি ফার্ম। তবে অভিজ্ঞতা না থাকায় শুরুতেই হোঁচট খান। পরে আরো কয়েকটি উদ্যোগ গ্রহণ করে সেগুলোতেও ব্যর্থ হন তিনি। কিন্তু একের পর এক ব্যর্থতা থামিয়ে দিতে পারেনি অদম্য এই তরুণকে। সব ব্যর্থতাকে দু’পায়ে মাড়িয়ে সামনে এগিয়ে গেছেন তিনি।



বর্তমানে বেকারমুক্ত দেশ গড়ার লক্ষ্যে ‘উদ্যোক্তাগিরি’ নামের একটি প্ল্যাটফর্ম নিয়ে কাজ করছেন তরুণ উদ্যোক্তা রন মাহিনুর।


সম্প্রতি বিবার্তার মুখোমুখি হয়ে জানালেন উদ্যোক্তা হওয়ার পথে নানা ধরনের চ্যালেঞ্জ এবং এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার বিচিত্র অভিজ্ঞতার কথা। নানা ঘাত-প্রতিঘাত পেরিয়ে রন মাহিনুরের উদ্যোক্তা হয়ে উঠার গল্প বিবার্তার পাঠকদের জন্য তুলে ধরছেন উজ্জ্বল এ গমেজ।


ঠাকুরগাঁও জেলার পীরগঞ্জ উপজেলার হাজিপুর ইউনিয়নের ভেবড়া গ্রামে জন্ম রন মাহিনুরের। বাবা মো. মোস্তফা আলম পেশায় সরকারি চাকুরে এবং মা মোছা. রীনা আক্তার গৃহিণী। দুই ভাই-বোনের মধ্যে ছোট মাহিনুর। বড়বোন মোছা. মুশফিকা আলম একটি প্রাইভেট কোম্পানিতে চাকরি করেন।


২০০৭ সালে পীরগঞ্জ পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং ২০০৯ সালে ঢাকার নটরডেম কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন রন। ২০১০ সালে ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ডিপার্টমেন্ট অব সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের প্রথম ব্যাচে ভর্তি হন। ছাত্রাবস্থাতেই হয়ে ওঠেন তরুণ উদ্যোক্তা।



২০১২ সালের ১ মার্চে সুপার সফট আইটি প্রতিষ্ঠানের মধ্য দিয়ে শুরু হয় মাহিনুরের উদ্যোক্তা জীবনের পথ চলা। তবে সেই যাত্রা বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। এরপর আরো কয়েকটি উদ্যোগ গ্রহণ করলেও সফলতার সাথে সেখানে থাকে ব্যর্থতাও। উদ্যোগগুলোর মধ্যে হোস্টিং প্রতিষ্ঠান হোস্টবক্স, স্পোর্টস সামগ্রী বিক্রয়ের ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান স্পোর্টিফাই, টিমবক্সারসহ প্রায় পাঁচটি প্রতিষ্ঠান তৈরি করেন তিনি। এগুলোর মধ্যে অ্যালগরিদম একটি। এটি একটি ইনফরমেশন টেকনোলজি কম্পানি। এটার মূল কাজ হল প্রব্লেম সলভিং, ইনোভেশন, রিসার্চ অ্যান্ড ডেভলপমেন্ট। এটা দেশের অন্যান্য আইটি কোম্পানি থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং অন্য ধাচের কাজ করে। এর মূল লক্ষ্য হল বিদ্যমান সমস্যাগুলোর প্রযুক্তিগত সমাধান বের করা, যা পৃথিবীর মানুষ, সমাজ, জাতি, রাষ্ট্র, দেশ সকলের কাজে আসে। বাংলাদেশে এই ধরনের কম্পানি সম্ভবত এটাই প্রথম। বর্তমানে তারা ইন্টারনেট অব থিংস-বিষয়ক স্মার্ট প্রোডাক্ট তৈরি নিয়ে গবেষণা চালাচ্ছেন। আশা করছেন, খুব শীঘ্রই জনগণের প্রয়োজনে আসবে এমন একটি স্মার্ট পণ্যের রূপরেখা সবার সামনে নিয়ে আসতে পারবেন।


অ্যালগরিদমের প্রথম ইনোভেশন হল ‘উদ্যোক্তাগিরি’, যেটার মূল উদ্দেশ্য বেকার সমস্যা সমাধান করা। মাহিনুরের ভাষায়, উদ্যোক্তা তৈরি হলে নতুন চাকরির ক্ষেত্র তৈরি হবে, ইভেঞ্চুয়ালি বেকার সমস্যার সমাধান হবে। এটা একটা ধীর কিন্তু নিশ্চিত প্রক্রিয়া। শিগগিরই আমাদের আরো কয়েকটি ইনোভেশন উন্মুক্ত করা হবে।


মাহিনুর বলেন, বর্তমানে সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর একটি হলো বেকার সমস্যা। দেশে বর্তমানে ৪৭% শিক্ষিত বেকার রয়েছে। ‘উদ্যোক্তাগিরি’ উদ্যোক্তাদের জন্য একটি অনলাইন প্ল্যাটফর্ম। বেকার সমস্যা সমাধান, উদ্যোক্তা প্রমোশন, উন্নয়ন, তৈরি করা এবং এর মাধ্যমে নতুন চাকরির সম্ভাবনা তৈরি করাই এর মূল লক্ষ্য।



শুরুতে কয়েকটি উদ্যোগ ব্যর্থ হওয়ার প্রসঙ্গে মাহিনুর বলেন, ব্যর্থ হয়েছি মূলত কিছু দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার অভাবে। সত্যি কথা বলতে, প্রথমে যখন উদ্যোগ শুরু করি তখন একজন উদ্যোক্তা হওয়ার জন্য যে সকল গুণাবলী নিজের মধ্যে থাকা প্রয়োজন সেগুলো আমার মধ্যে ছিল না। বিশেষ করে আমার মধ্যে ধৈর্যের অনেক অভাব ছিল। আর ব্যর্থতার আরো একটি বড় কারণ হচ্ছে ভুল সিদ্ধান্ত নেয়া।


উদ্যোক্তা হওয়ার পথে বাধা সম্পর্কে মাহিনুরের ভাষ্য, সবচেয়ে বড় বাধা আসে আমাদের পরিবার থেকে। তারা কোনোভাবেই চায় না যে এত রিস্ক নিয়ে তাদের সন্তান উদ্যোক্তা হোক। কারণ চাকরিতে যদি ১০% রিস্ক ফ্যাক্টর থাকে, তাহলে উদ্যোগে ১০০%। সেকারণে তারা এটা মেনে নিতে চায় না। পরিবারের পরে আরো বাধা আসে সমাজ, রাষ্ট্রের বিভিন্ন জটিলতাপূর্ণ সিস্টেমের কারণে। আপনি যেকোনো কাজ করতে যদি সরকারি অফিস-আদালতে যান, তাহলেই বুঝতে পারবেন কত রকমের অনিয়ম ও সমস্যায় জর্জরিত এই ব্যবস্থা।


তিনি বলেন, এইসব বাধা-বিপত্তি এড়িয়ে, চ্যালেঞ্জকে সামলে নিয়ে যারা এগিয়ে যেতে পারেন, ব্যর্থতা থেকে যারা শিক্ষা গ্রহণ করে ধৈর্য্যসহকারে ধীরে ধীরে যারা এগিয়ে যেতে পারেন তারাই কেবল সফল হওয়ার আসল দাবিদার। বর্তমান সরকারের আমলে ধীরে ধীরে উদ্যোক্তাবান্ধব একটি ইকো-সিস্টেম গড়ে উঠছে। আশা করছি, ভবিষ্যতে চারিদিকে একটি উদ্যোক্তাবান্ধব পরিবেশ বিরাজ করবে যেটা তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য অত্যাবশ্যকীয় বলে আমি মনে করি।



উদোক্তা হিসেবে অর্জন সম্পর্কে মাহিনুর বলেন, আমাদের প্রথম টার্গেট ছিল বাংলাদেশে ভিন্নধর্মী একটি প্রতিষ্ঠান দাঁড় করানো এবং সেটা সফলতার সাথে ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। আপাতত আমাদের প্ল্যাটফর্মে প্রায় ৩০০ জনের মতো উদ্যোক্তা লিস্টেড রয়েছেন। ভবিষ্যতে কিরকম সাড়া ফেলবে সেটার ওপর বাকি অর্জন নির্ভর করছে।


নবীন উদ্যোক্তাদের জন্য সুখবর হলো উদ্যোক্তাগিরি প্ল্যাটফর্ম থেকে ফ্রি কনসালটেন্সি প্রদান করা হচ্ছে এবং ভবিষ্যতে এই প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে যাতে তারা তাদের উদ্যোগের জন্য ইনভেস্টমেন্ট, মেন্টর এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ করতে পারেন সেই ব্যবস্থা করা হচ্ছে।


মাহিনুর বলেন, আমাদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য শুধু জনকল্যাণমূলক প্রযুক্তিগত সমস্যার সমাধান বের করা এবং আমরা সেই পথে অনেক দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলছি ইনশাআল্লাহ্‌। আমরা ভবিষ্যতে সবাই মিলে বাংলাদেশ থেকে পৃথিবীকে টেকনোলজির ‘দ্য নেক্সট বিগ থিং’ টি উপহার দিতে চাই।


বিবার্তা/উজ্জ্বল/হুমায়ুন/মৌসুমী

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: bbartanational@gmail.com, info@bbarta24.net

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com