এক স্বপ্নবাজ উদ্যোক্তার স্বপ্ন পূরণের গল্প
প্রকাশ : ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ১৮:৫৭
এক স্বপ্নবাজ উদ্যোক্তার স্বপ্ন পূরণের গল্প
উজ্জ্বল এ গমেজ
প্রিন্ট অ-অ+

সব মানুষের স্বপ্ন পূরণ হয় না। কিছু স্বপ্ন থেকে যায় অধরা। তবে একটা সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য আর সেই লক্ষ্যে পৌঁছাতে কঠোর পরিশ্রম ও অদম্য ইচ্ছাশক্তিই পারে একজনকে তার কাঙ্খিত স্বপ্ন পূরণ করতে। উদ্যোক্তা সোহেল রানার বেলায়ও হয়েছে তাই।


কৃষক পরিবারের সন্তান সোহেল ছোটবেলা থেকেই একটা সুন্দর ফলের বাগান করার স্বপ্ন দেখতেন। যেখানে সারি সারি করে লাগানো থাকবে বিভিন্ন ধরনের ফল ও ফুলের গাছ। একদিন সেই বাগান ভরে উঠবে বিচিত্র ধরনের ফুল আর ফলে। শৈশবের সেই স্বপ্ন আজ তার পূরণ হয়েছে। তিনি এখন সফল খামারি। কিন্তু কাজটা সহজ ছিল না। তাকে পেরোতে হয়েছে অনেক কঠিন পথ।


কী ছিল সেই যাত্রা পথের ঘটনাগুলো। এসব জানতে হলে যেতে হবে আরো অনেক পেছনে।


নওগাঁর পত্নীতলা উপজেলার রূপগ্রাম এলাকার নিম্নমধ্যবিত্ত কৃষক পরিবারে জন্ম সোহেল রানার। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগে পড়াশোনা করা অবস্থায় ক্যাম্পাস প্রতিনিধি হিসেবে দৈনিক ইত্তেফাকে কাজ শুরু করেন তিনি। স্নাতকোত্তর শেষে সেখানেই ফিচার বিভাগের তথ্যপ্রযুক্তি পাতায় কাজ শুরু করেন।


পরে বেশ কয়েকটি ম্যাগাজিনেও কাজ করেন। বড় ছেলে হিসেবে ছাত্র অবস্থাতেই পরিবারের দায়িত্ব এসে পড়ে সোহেলের উপরে। তাই পড়াশোনা শেষে চাকরি করা ছাড়া অন্য কিছু ভাববার সুযোগ ছিল না।


‘রূপগ্রাম এগ্রো ফার্ম’ এর পেয়ারা চাষী সোহেল রানা। ছবি : ফেসবুক থেকে‘রূপগ্রাম অ্যাগ্রো ফার্ম’ এর পেয়ারা চাষী সোহেল রানা। ছবি : ফেসবুক থেকে।


জীবনের প্রয়োজনের তাগিদে সাংবাদিকতা করলেও তার মনে সারাক্ষণ ঘুরে বেড়াচ্ছিল সেই বাগান করার স্বপ্নটা। কোনোভাবেই মনে শান্তি পাচ্ছিলেন না। দিনের মধ্যে হাজারো কাজের ভিড়ে সময় পেলেই পত্র-পত্রিকায় দেশের বিভিন্ন স্থানের সফল খামারিদের গল্প আগ্রহ নিয়ে পড়তেন। আর সপ্তাহের ছুটির দিনে সুযোগ পেলেই চলে যেতেন সেসব খামার পরিদর্শনে।


২০১৪ সালের কথা। একদিন সাহস করে চাকরি ছেড়ে দেন এই স্বপ্নবাজ সাহসী উদ্যোক্তা। বাড়িতে এসে স্বজনদের জানান নিজের স্বপ্নের কথা। শুরুতে বেশিরভাগ আত্মীয়-স্বজন ও এলাকাবাসী নিরুৎসাহিত করলেও একপ্রকার স্রোতের বিপরীতে ছোট ভাই আব্দুল বারীকে সঙ্গে নিয়ে ১২ বিঘা জমিতে গড়ে তোলেন স্বপ্নের সমন্বিত কৃষি খামার। তার খামারের নাম দেন ‘রূপগ্রাম অ্যাগ্রো ফার্ম’।


বর্তমানে ১২০ বিঘা জমির সমন্বিত এই কৃষি খামারে ১৪ জন কর্মী সার্বক্ষণিক কাজ করছেন। কাজের প্রয়োজনে চুক্তিভিত্তিক কর্মীকেও নিয়োগ দেন সোহেল।


‘রূপগ্রাম অ্যাগ্রো ফার্ম’ এ সোহেল রানা। ছবি : ফেসবুক থেকে।


তার বাগানে ফলের গাছের মধ্যে রয়েছে আম, লিচু, কাঁঠাল, ড্রাগন ফল, মাল্টা, খাটো জাতের নারকেল, লেবুসহ ৫০ প্রজাতির ফলের গাছ। খামারে আরো আছে বাসক, তুলসী, নিম, নীল অপরাজিতা, সাদা লজ্জাবতীসহ নানা প্রজাতির ঔষধি গাছ। আছে বিভিন্ন জাতের ফুল গাছও।


এ ছাড়া তিনটি পুকুরে মাছ চাষ করছেন এই উদ্যোক্তা। করছেন হাঁস-মুরগি ও ছাগল পালনও। সমন্বিত খামারের পাশে ১০ বিঘা জমিতে গড়ে তুলেছেন আমের বাগান। পাশের সাপাহার উপজেলার মানিকুড়া গ্রামে পাঁচ বিঘা জমি ইজারা নিয়ে চাষ করছেন থাই পেয়ারা।


খামারে হ্যামকে শুয়ে বই পড়ছেন সোহেল রানা। ছবি : ফেসবুক থেকে।


সোহেলের সমন্বিত কৃষি খামার এখন এলাকার শিক্ষিত বেকারদের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস। তার বাগান দেখে এখন অনেকেই মিশ্র ফলের বাগান করছেন। রূপগ্রামসহ আশপাশের এলাকায় গড়ে উঠেছে শতাধিক ফলের বাগান। এসব বাগানে আম, পেয়ারা, লেবু, স্ট্রবেরি ও কুল গাছই বেশি।


সফল খামারি হওয়ার জন্য যুব উন্নয়ন অধিদফতর, আরডিএ, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও বিএমডিএ থেকে কৃষির ওপর বিভিন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছেন সোহেল।


বিটিভি'র কৃষিবিষয়ক ‌‘মাটি ও মানুষ’ অনুষ্ঠানে জন্য দেওয়ান সিরাজের সাথে কথা বলছেন সোহেল রানা। ছবি : ফেসবুক থেকে।


এ উদ্যোগের বিষয়ে সোহেলের ভাষ্য, আমাদের কৃষিনির্ভর দেশে কৃষি সবচেয়ে অবহেলিত পেশা। তরুণরা পেশা হিসেবে কৃষিকে বেছে না নেয়ার একটা প্রবণতা চালু রয়েছে। এই বৃত্ত ভেঙে প্রাকৃতিক উপায়ে আধুনিক প্রযুক্তির সহায়তায় সমন্বিত কৃষিতে তরুণদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধিই আমার লক্ষ্য। সার, বিষ, ফরমালিন ভেজালের বেড়াজাল থেকে প্রাকৃতিক কৃষির সুবাতাস পৌঁছে দিতেই এ উদ্যোগ। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার হিসাবে বাংলাদেশ চাষের মাছ উৎপাদনে বিশ্বে চতুর্থ, সবজি চাষের জমি বৃদ্ধির হারে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে প্রথম আর উৎপাদন বৃদ্ধির হারে তৃতীয়। স্বাধীনতার পর থেকে সবজি উৎপাদন বেড়েছে পাঁচ গুণ। ফল উৎপাদন বৃদ্ধির দিক থেকেও বাংলাদেশ এখন বিশ্বে শীর্ষে রয়েছে। আর এসব সাফল্যের ধারায় তরুণদের অংশগ্রহণ যোগ করেছে নতুন মাত্রা।


পরিশ্রমী উদ্যোক্তার ক্যাটাগরিতে এ বছর ‘চাকরি খুঁজব না চাকরি দেব’-এর পক্ষ থেকে রূপগ্রাম অ্যাগ্রো ফার্মকে ইউসুফ চৌধুরী সম্মাননা ২০১৮ প্রদান করা হয়। প্রথমবারের মত এই বিশেষ সম্মাননা পাওয়ায় রূপগ্রাম এগ্রো ফার্মের পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি অশেষ কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন সোহেল।


‘রূপগ্রাম অ্যাগ্রো ফার্ম’ এর ড্রাগন ফল হাতে সোহেল রানা। ছবি: ফেসবুক থেকে।


নওগাঁর প্রত্যন্ত এলাকা সাপাহারে অ্যাগ্রো ট্যুরিজম গড়ে তুলতে চান স্বপ্নবাজ এই উদ্যোক্তা। যেখানে থাকবে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন পুষ্টিগুণসম্পন্ন বিভিন্ন স্বাদের ফল ও বাহারি রঙের ফুল। এছাড়া বিলীন হতে বসা বিভিন্ন দেশি গাছের (জার্ম প্লাজম) সংরক্ষণাগার গড়ে তোলার স্বপ্ন রয়েছে তার। এই লক্ষ্যে সাপাহারে আরো ১৫ একর জমিতে মিশ্র ফলের বাগান গড়ে তুলছেন।


বিবার্তা/উজ্জ্বল/জাই

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

ময়মনসিংহ রোড, শাহবাগ, ঢাকা-১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: bbartanational@gmail.com, info@bbarta24.net

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com